ভারতের অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের আদলে একই নামে ঢাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেরানীগঞ্জের কলাতিয়ায় প্রায় ২০ বিঘা জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে এই স্থাপনা। মসজিদের পাশাপাশি সেখানে একটি আধুনিক কওমি মাদ্রাসাও থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সাধারণ মানুষের কাছে অনুদান দিয়ে পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
বাবরি মসজিদের আদলে নির্মাণাধীন এই মসজিদের গম্বুজসহ বিভিন্ন স্থাপনায় মোগল স্থাপত্যের ছোঁয়া থাকবে। পাশাপাশি এতে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীরও সমন্বয় করা হবে।
কলাতিয়ায় ‘জামিয়াতুত তারবিয়া আল ইসলামিয়া’ নামের একটি কওমি মাদ্রাসা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই বৃহৎ পরিসরে মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আধুনিক এই কমপ্লেক্স তৈরির মূল উদ্যোক্তা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার উদ্যোগে ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি কলাতিয়ায় বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)।
২০২১ সালে বাংলাদেশে মোদিবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আলেমদের ওপর ধরপাকড় শুরু করে। অনেকে জেল-জুলুমের শিকার হন। আলেমদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ওই পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে মসজিদ-মাদ্রাসা কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ থেমে যায়।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন করে প্রকল্পটি নিয়ে তৎপরতা শুরু করেন মাওলানা মামুনুল হক। সাধারণ মানুষের অনুদানে এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকার মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ৭০০ ফুট দীর্ঘ একটি সংযোগ সড়ক।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর রোববার ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় আরএসএসের নেতৃত্বে কয়েক লাখ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাড়ে চারশ বছরের বেশি সময় আগে নির্মিত বাবরি মসজিদটি ভেঙে ফেলে। তাদের দাবি ছিল, রামের জন্মভূমি ধ্বংস করে সেখানে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল।
ওই ঘটনার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। পরদিন ৭ ডিসেম্বর দেশের সব রাজনৈতিক দল ঘটনার নিন্দা জানায়। ইসলামপন্থি দলগুলো হরতাল পালন করে। মাওলানা মামুনুল হকের বাবা শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)-এর নেতৃত্বে বাবরি মসজিদ অভিমুখে লংমার্চও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে অযোধ্যা থেকে ধীরে ধীরে বাবরি মসজিদের অবকাঠামো মুছে যায়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ২০১৯ সাল থেকে সেখানে রাম মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মন্দিরটির উদ্বোধন করেন।
বাবরি মসজিদের স্মৃতি ধরে রাখতে একই নামে ও ওই মসজিদের আদলে ঢাকায় নতুন মসজিদটি নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এতে অযোধ্যার বাবরি মসজিদের মতো তিনটি গম্বুজ, স্থাপত্য ও অন্যান্য অবকাঠামো রাখা হচ্ছে। এর সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ও থাকবে।
জামিয়াতুত তারবিয়া ও বাবরি মসজিদ কমপ্লেক্সের পরিচালক মাওলানা মামুনুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কলাতিয়ায় বড় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করছি। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই মসজিদ থাকবে। সেই মসজিদের নামকরণ করেছি বাবরি মসজিদ। অযোধ্যার বাবরি মসজিদের স্মৃতিকে জাগ্রত এবং এর সঠিক ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর জন্যই এ নাম রেখেছি।’
মসজিদের নির্মাণকাজ শুরুর এক বছর পর ২০২১ সালে এর উদ্যোক্তা মাওলানা মামুনুল হক কারাবন্দি হন। ওই সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মসজিদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। মাদ্রাসা থেকে শিক্ষক-ছাত্রসহ আটজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। এরপর প্রায় চার বছর মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার পাশাপাশি মাদ্রাসার কার্যক্রমও বন্ধ ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবার বাবরি মসজিদ কমপ্লেক্সের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে বাবরি মসজিদসহ তারবিয়ার কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে যায়। থেমে যায় চলার গতি। প্রায় চার বছর পর্যন্ত এখানে ফ্যাসিবাদের দখলদারত্ব ছিল। ফ্যাসিবাদের পতনের পর আবার নতুন করে আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অভিজ্ঞ ও দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের তত্ত্বাবধানে মূল প্রকল্পের আধুনিক নকশা বা ডিজাইন তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।’
মসজিদের নির্মাণকাজ কবে শেষ হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের অনুদানের ওপরই নির্ভর করবে, এর কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে। তবে আমরা দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি। মূল মসজিদের নির্মাণ কাজ চলতি বছরেই শুরু করব ইনশাল্লাহ।’
এ সময় তিনি মসজিদ প্রতিষ্ঠার কাজে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ও প্রবাসীদের আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।
বাবরি মসজিদ কমপ্লেক্সের জন্য জায়গাটি কেনার সময় সেখানে ১২ থেকে ১৪ ফুট গভীর খাদ ছিল। বর্তমানে মাটি দিয়ে সেটি ভরাট করা হয়েছে। কমপ্লেক্সের সঙ্গে ৭০০ ফুট দীর্ঘ সংযোগ সড়কও নির্মাণ করা হয়েছে।
খুব দ্রুত মূল পর্বের কাজ ও অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন বাবরি মসজিদ কমপ্লেক্সের পরিচালনা কমিটির সদস্য মাওলানা জাহিদুজ্জামান।
তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে ৫ হাজার বর্গফুটের অস্থায়ী মসজিদ এবং এর চারপাশ ঘিরে আরও ৫ হাজার বর্গফুটের উন্মুক্ত বারান্দা নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি স্থানীয় মুসল্লি ও ছাত্রদের সম্মিলিত নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করবে।’
মসজিদ নির্মাণে কোনো নির্দিষ্ট বড় দাতার অনুদান বা বিদেশি ফান্ড নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ মানুষের সহযোগিতাতেই এর কার্যক্রম চলছে। কেউ এক বস্তা সিমেন্ট দিচ্ছেন, কেউ বালু কেনার অর্থ দিচ্ছেন, আবার কেউ রড দিচ্ছেন। কেউ নিজের সঞ্চিত অর্থ নিয়েও সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসছেন।
বাবরি মসজিদ নির্মাণে অনুদানের আহ্বান জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মাওলানা মামুনুল হকের পেজ থেকেও প্রচার করা হয়েছে।
মাওলানা জাহিদুজ্জামান বলেন, ‘মসজিদ নির্মাণে বড় দাতার অনুদান বা বিদেশি ফান্ড নেই। সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষের সহযোগিতায় মসজিদের নির্মাণ কাজ চলছে। মানুষের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ১ লাখ টাকা প্রদান করে জমিদাতা সদস্য হওয়া যাবে। মসজিদের প্রতি স্কয়ার ফিট নির্মাণ ব্যয় ৩ হাজার টাকা, এক জায়নামাজ সমপরিমাণ (৮ স্কয়ার ফিট) জায়গার নির্মাণ ব্যয় ২৪ হাজার টাকা। এ ছাড়াও সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ অর্থ দিয়ে শরিক হওয়া যাবে।’
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো পেমেন্ট মেথডে অনুদান পাঠাতে tagleebedin.com/babri-masjid-এ ভিজিট করা যাবে। এ ছাড়া 01737241621 নম্বরে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে অনুদান পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।
ব্যাংকের মাধ্যমে অনুদান পাঠানোর জন্য হিসাবের নাম Babri Masjid Dhaka এবং অ্যাকাউন্ট নম্বর 20506640200295607। ব্যাংক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, কলাতিয়া বাজার সাব-শাখা, ঢাকা। অনুদানসংক্রান্ত যোগাযোগের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর 01339-491061 দেওয়া হয়েছে।
সম্রাট জহির উদ্দিন বাবর মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ১৫২৭ সালে অযোধ্যার নিয়ন্ত্রণ নেন তার সেনাপতি মীর বাকি। এর পরের বছর, ১৫২৮ সালে সম্রাট বাবরের নামে সরজু নদীর তীরে তিন গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন মীর বাকি।
মসজিদটি নির্মাণের ৩৫৭ বছর পর ১৮৮৫ সালে সেটিকে ঘিরে বিতর্ক ও আইনি লড়াই শুরু হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর অযোধ্যার ওই জমিতে হিন্দুদের মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
/এসএন