ছবি: সংগৃহীত
শিশু রামিসার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো দেশ। ছোট্ট এই শিশুর মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনে। সেই শোক যেন ছুঁয়ে গেছে রামিসার আদরের পোষা বিড়ালটিকেও। পরিবারের দাবি, গত দুই দিন ধরে বিড়ালটি কিছুই খাচ্ছে না।
বুধবার মুন্সিগঞ্জে রামিসাকে দাফন শেষে পরিবারের সদস্যরা রাজধানীর পল্লবীর বাসায় ফিরে আসেন। বাসার প্রতিটি কোণজুড়ে এখন ছড়িয়ে আছে রামিসার স্মৃতি, যা পরিবারকে আরও বেশি শোকাহত করে তুলছে।
রামিসার ফুপু হাসনাহেনার নিজের কোনো সন্তান নেই। তিনি রামিসাকে নিজের মেয়ের মতোই আদর-স্নেহে বড় করছিলেন। রান্নাঘরে শুয়ে থাকা বিড়ালটির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “রামিসার বিড়ালটাও শোকে গতকাল থেকে কিছুই খাচ্ছে না। বিড়ালটা ওর ভালোবাসা অনুভব করছে।”
পাশে দাঁড়িয়ে কথা বললেও বিড়ালটি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে ছিল সেটি। টেনে ধরেও তাকে খাওয়ানো সম্ভব হয়নি। কথা বলতে বলতে একটি বাটিতে খাবার নিয়ে বিড়ালের সামনে ধরেন হাসনাহেনা। কিন্তু তখনও কিছু খায়নি প্রাণীটি।
একপর্যায়ে বিড়ালটিকে ছেড়ে দিয়ে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। হাসনাহেনা বলেন, “এই অবুঝ বিড়ালটিও বুঝেছিল, রামিসা ওকে কত ভালোবাসতো। এই রকম ফুলের মতো মেয়ের সঙ্গে যে ব্যক্তি এমন নিষ্ঠুরভাবে নরপিশাচের মতো আচরণ করতে পারে, তাকে ফাঁসি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।”
দরজা খোলার পরই ঘটে ভয়াবহ ঘটনা
রামিসার মা পারভীনের কাছে মঙ্গলবারের সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য সাধারণ দিনের মতোই। প্রতিদিনের মতো আট বছরের মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উদ্বেগ।
ঘরের ভেতর, বারান্দা, সিঁড়ি—সব জায়গায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। পরে ভবনের অন্য বাসিন্দারাও সেই অনুসন্ধানে যোগ দেন।
রামিসাকে খোঁজার সময় একটি চিৎকারের শব্দও শুনেছিলেন বলে জানান পারভীন। তবে তখন তিনি বুঝতে পারেননি সেটি তার মেয়ের চিৎকার ছিল।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) বেসরকারি একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পারভীন বলেন, “আমি রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওকে বলছিলাম, দাঁত ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে স্কুল ড্রেস পরতে। এরপর ও পাশের রুমে যায় দাঁত ব্রাশ করতে।”
তিনি আরও বলেন, “রামিসার বড় বোন তখন চাচার বাসায় যাচ্ছিল। রামিসাও তার পেছনে যেতে চাইলে বড় বোন তাকে বাসায় থাকতে বলে। তখন রামিসা দরজার ভেতরেই ছিল। পরে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ওকে টান দিয়ে (পাশের ফ্ল্যাটে) নিয়ে যায়।”
ঘটনার পর সন্দেহজনক কিছু বিষয়ও তার চোখে পড়ে বলে জানান পারভীন। তিনি বলেন, “সেখানে (উল্টো পাশের দরজা) একটা জুতা ছিল, আরেকটা ছিল না। এরপর দেখি ওর বড় বোন চাচার বাসা থেকে একাই আসছে। তখন আমার সন্দেহ হলো। আমি একটা চিৎকারও শুনেছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি, ওই চিৎকার রামিসার ছিল। ভাবছিলাম পাশের ফ্ল্যাটের অন্য কোনো বাচ্চার চিৎকার।”
সন্দেহ হওয়ায় বারবার পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দেন পারভীন। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ দরজা খোলেনি। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে একটি কক্ষের খাটের নিচে রামিসার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। পরে বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় তার কাটা মাথা।