ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী মোটরসাইকেল সহজে শনাক্ত করতে সামনে নম্বর প্লেট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরার মাধ্যমে মোটরসাইকেলের নম্বর দ্রুত শনাক্ত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক সভায় মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বর প্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ)।
তবে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কারিগরি বিষয় সামনে এসেছে। দেশে চলাচলকারী অনেক মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বর প্লেট স্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নেই। ফলে নতুন করে প্লেট সংযোজন করলে মোটরসাইকেলের নকশা, বায়ুপ্রবাহ এবং নিরাপত্তায় কোনো ধরনের প্রভাব পড়বে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত দেওয়ার জন্য গত ১৩ আগস্ট সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিআরটিএ। নম্বর প্লেটের আকার, কোথায় এটি স্থাপন করা হবে এবং এআই ক্যামেরার মাধ্যমে প্লেটটি কার্যকরভাবে শনাক্ত করা সম্ভব কি না—এসব বিষয় যাচাই করবে কমিটি।
কমিটিতে বিআরটিএ ও ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং মোটরসাইকেল উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।
বর্তমানে মোটরসাইকেল ছাড়া অন্যান্য যানবাহনের সামনে ও পেছনে নম্বর প্লেট থাকে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার। প্রতি বছর দেশে প্রায় পাঁচ লাখ নতুন মোটরসাইকেল বিক্রি হয়।
মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে চালক, বিক্রেতা ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো এবং বর্তমান মডেলের মোটরসাইকেলে কীভাবে সামনে নম্বর প্লেট সংযোজন করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উত্তরা মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, সামনে ও পেছনে দুটি নম্বর প্লেট বসানোর কথা জানানো হলেও প্লেটের আকার বা নির্দিষ্ট মাপ সম্পর্কে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
খাতসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক মোটরসাইকেলে সামনের দিকে নম্বর প্লেট বসানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। ফলে এসব মোটরসাইকেলে পরিবর্তন আনতে হতে পারে। এতে সামনের অংশে বাতাসের চাপ বেড়ে গেলে উচ্চগতিতে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে। আবার হেডলাইটের নিচে কিংবা রেডিয়েটরের সামনে প্লেট স্থাপন করা হলে ইঞ্জিনে বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়ে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমানে রাস্তায় চলাচল করা পুরোনো সব মোটরসাইকেলের সামনেই নম্বর প্লেট বসানো হবে, নাকি কেবল নতুন মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর করা হবে, সেটিও এখনো পরিষ্কার হয়নি।
ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। গত ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়।
এআইভিত্তিক ক্যামেরার সঙ্গে সড়ক পরিবহন আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার সফটওয়্যার যুক্ত করা হয়েছে। কোনো যানবাহন আইন লঙ্ঘন করলে ক্যামেরার মাধ্যমে সেটি শনাক্ত করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের নামে ডিজিটালভাবে মামলা করা হচ্ছে।
এ কাজে বর্তমানে ‘পিটিজেড ক্যামেরা’ ব্যবহার করছে পুলিশ। এসব ক্যামেরা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে চলন্ত যানবাহন শনাক্ত ও অনুসরণ করার সক্ষমতাও রয়েছে এসব ক্যামেরার।
তবে সড়ক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, শুধু মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট বসিয়ে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহন শনাক্তের সমস্যার পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন বা আরএফআইডি প্রযুক্তি আরও কার্যকর হতে পারে বলে মত দিয়েছেন তারা।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, প্রতিটি গাড়িতে আরএফআইডি চিপ থাকলে দূর থেকেই গাড়িটি শনাক্ত করা সম্ভব। কোনো গাড়ির নম্বর প্লেট কাপড় বা ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা গেলেও রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে কাজ করা আরএফআইডি ট্যাগ সহজে আড়াল করা যায় না।
আরএফআইডি প্রযুক্তিতে গাড়ির সঙ্গে যুক্ত বিশেষ একটি ট্যাগে থাকা স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর রিডারের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। সড়ক, টোল প্লাজা কিংবা প্রবেশপথে স্থাপিত রিডার গাড়িটি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে পাঠাতে পারে। এর মাধ্যমে গাড়ির পরিচয় এবং চলাচলের সময়ও সংরক্ষণ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতুতে টোল আদায়ের ক্ষেত্রেও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সড়ক ব্যবস্থাপনায় আরএফআইডির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে যানবাহন শনাক্তকরণ এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী মোটরসাইকেল শনাক্ত করতে সামনে নম্বর প্লেট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর কারিগরি বাস্তবতা, নিরাপত্তা এবং পুরোনো মোটরসাইকেলে প্রয়োগের বিষয়গুলো এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সাত সদস্যের কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
/এসএন