রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত সাবেক গণভবন এখন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। জাদুঘরটিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন স্মারক, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নথিপত্র এবং নানা ঐতিহাসিক উপকরণের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহৃত ‘লাল টেলিফোন’।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়, নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করলে এই টেলিফোন থেকে শেখ হাসিনার সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্মকর্তার রেকর্ডকৃত অডিও কথোপকথন শোনা যাচ্ছে। এসব অডিওর অধিকাংশই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার বলে জানানো হয়েছে। লাল টেলিফোনগুলো ঘিরে দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।
জাদুঘরের নিচতলায় শেখ হাসিনার অফিস কক্ষে তিনটি আলাদা টেবিলে মোট ছয়টি লাল টেলিফোন রাখা হয়েছে। প্রতিটি টেবিলের সামনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন ব্যক্তির নাম এবং সংশ্লিষ্ট নম্বরের তালিকা রয়েছে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি টেলিফোনে প্রায় শতাধিক কল রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শুনতে পারেন। অনেককে শেখ হাসিনার অফিস কক্ষের চেয়ারেই বসে মনোযোগ দিয়ে এসব অডিও শুনতে দেখা গেছে।
টেলিফোনগুলোর একটিতে ৭০৮ নম্বরে কল করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনা যায়। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার মোট পাঁচটি কথোপকথন সংরক্ষিত আছে।
এছাড়া আরেকটি লাল টেলিফোনে ৭১১ নম্বরে কল করলে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের সঙ্গে শেখ হাসিনার অডিও কথোপকথন শোনা যায়। এ অংশে সার্বক্ষণিক দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
লাল টেলিফোনের সামনে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ ইয়াসিন নামে এক দর্শনার্থীকে বলতে শোনা যায়, “আপাকে একটাই কথা বলি, ভারতে থেকে ষড়যন্ত্র করে লাভ নাই। বাংলাদেশে ফিরে আসেন।”
তেজগাঁও থেকে বন্ধুদের নিয়ে জাদুঘর দেখতে আসেন শহীদুল ইসলাম। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লাল টেলিফোনে বিভিন্ন অডিও শুনছিলেন। পরে তিনি জানান, ৭৭০৮ নম্বরে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের নাম দেখা যায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে সাদ্দাম হোসেনের প্রায় নয়টি ভয়েস কল রয়েছে, যেখানে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং শেখ হাসিনাও নানা ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন।
আরেক দর্শনার্থী কাওসার হোসেন বলেন, জাদুঘরের বিভিন্ন প্রদর্শনীর মধ্যে লাল টেলিফোনের বিষয়টি তার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। তার ভাষায়, একেকটি নম্বরে কল করলে একেকজনের কথোপকথন শোনা যাচ্ছে।
শুধু লাল টেলিফোনই নয়, জাদুঘরের ওই কক্ষে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম হওয়া বহু ব্যক্তির ছবি কাঠে খোদাই করে প্রদর্শন করা হয়েছে। এ অংশেও দর্শনার্থীদের উল্লেখযোগ্য ভিড় ছিল।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘ আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে রাজধানীর সাবেক গণভবনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের প্রথম দিন কেবল জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিদের প্রবেশের সুযোগ ছিল। বৃহস্পতিবার থেকে এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে সময়ভিত্তিক (স্লট) টিকিট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অনলাইনে টিকিট সংগ্রহের জন্য দর্শনার্থীদের নির্ধারিত ‘জুলাই ৩৬’ ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে সময় নির্বাচন করতে হবে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত অনলাইন বা অফলাইনে সংগ্রহ করা টিকিট প্রদর্শন করে জাদুঘর পরিদর্শন করা যাবে।
/এসএন