• ঢাকা
  • বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম


২৩ দিনের আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার বিদায়, ছাত্র-জনতার বিজয়ের দিন ৫ আগস্ট

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৫ আগস্ট ২০২৬ ৩:০৪ পিএম

টানা ২৩ দিনের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গভবন থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে দেশ ত্যাগ করেন। পরে ভারতের আগরতলা হয়ে দিল্লিতে পৌঁছান তিনি। এর মধ্য দিয়ে টানা সাড়ে ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। তবে পরবর্তী সময়ে তার পুরো শাসনামলে আর কোনো গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ভোটাধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতা হরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থ পাচার, স্বজনপ্রীতিনির্ভর পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করা, ব্যাংক খাতে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি এবং আয়বৈষম্য বাড়ানোর অভিযোগও তার সরকারের বিরুদ্ধে ওঠে। অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা তুলে ধরা হলেও শেষ সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সরকারের সেই সাফল্যের দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ক্ষোভ জমে ছিল, যা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সেই বিস্ফোরণের উপলক্ষ তৈরি করে। এর আগে ২০১৫ সালের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন এবং ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও একই ধরনের জনঅসন্তোষের ইঙ্গিত দেখা গিয়েছিল।

কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ১ জুলাই। ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজাকার’ প্রসঙ্গের বক্তব্য এবং শিক্ষার্থীদের দাবিকে আইন-আদালতের প্রক্রিয়ায় নেওয়ার চেষ্টা পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দেয়। ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসেন। তাদের স্লোগান ছিল—‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’ দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের মধ্যে এটিই ছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য ছাত্রবিক্ষোভগুলোর একটি।

দমন-পীড়ন ও প্রাণহানি

১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে মাঠে নামানো হয়। সেদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন, ‘রাজাকার’ স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগ দেবে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের মারধর এবং গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে।

১৭ জুলাই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলনে নতুন গতি আসে। এরপর দেশজুড়ে উচ্চারিত হতে থাকে—‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি, গুলি কর।’

১৯ জুলাই কারফিউ জারির পাশাপাশি ‘শুট অন সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশের কথা জানান ওবায়দুল কাদের। এরপর বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক দিনের মধ্যে ২০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিহত হন। এতে শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারাও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।

সরকার শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি মেনে না নিয়ে গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। কয়েক দিনের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে তারা দাবি করেন, আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা দিতে তাদের বাধ্য করা হয়েছিল।

এক দফা দাবি ও সরকারের পতন

সমন্বয়কদের মুক্তির পর ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ৯ দফা দাবিকে এক দফায় রূপ দেওয়া হয়। সেখানে সরকারের পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। একই সময় সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং পুলিশও গুলি চালাতে অনাগ্রহ দেখায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

৪ আগস্ট শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের রাজপথে নামান। ওই দিনের সংঘর্ষে ১১৪ জন নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে তারা বেশিক্ষণ রাজপথে থাকতে পারেননি। একই দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।

৫ আগস্ট সকালে কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হলেও দুপুরের দিকে সরকারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। বেলা সোয়া ১টার দিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানায়, সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। এরপর লাখো মানুষ রাজধানীর রাজপথে নেমে আসেন। বেলা আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীজুড়ে উচ্ছ্বাস দেখা দেয়।

পরে গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জনতা প্রবেশ করে। একই সঙ্গে ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, আওয়ামী লীগের কার্যালয় এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাসভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও থানায়ও হামলার খবর পাওয়া যায়। বিকেল ৪টায় সেনাপ্রধান ঘোষণা দেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে।

‘জেন জি’ প্রজন্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ছাত্রী ও নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তৃত ব্যবহার।

মূলধারার অনেক গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও চাপের অভিযোগের মধ্যে ফেসবুক ও টুইটার আন্দোলনকারীদের প্রধান যোগাযোগমাধ্যমে পরিণত হয়। সেখানে বিক্ষোভের ছবি, গুলি চালানোর ভিডিও এবং নিহতদের স্বজনদের অভিজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ ‘জেন জি’ প্রজন্ম নিজেদের কৌশলে আন্দোলন পরিচালনা করেছে এবং বারবার ইন্টারনেট বন্ধ করেও তাদের থামানো যায়নি।

এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন প্রজন্ম অনলাইন জগতের বিশ্বনাগরিক। তারা গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করে। তার ভাষায়, ‘একজন সরকারপ্রধানের পদত্যাগে নতুন প্রজন্মের সব সমস্যা মিটবে না। নতুন সরকারকে তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হবে।’

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শেখ হাসিনা কারও কথা শোনেননি। তার একগুঁয়েমি ও ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দলটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। কোটা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো এবং ৪ আগস্ট দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নামানো ছিল তার সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত তিনি বিদেশে চলে যান বলে ওই নেতা মন্তব্য করেন।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এরশাদের চেয়ে শেখ হাসিনা শত গুণ বেশি খারাপ হয়ে বিদায় নিয়েছেন। এরশাদ পালাননি, তিনি পালিয়েছেন। আর পালিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগ দলটাকে ধ্বংস করে দিয়ে গেলেন। তার হিংসা, দম্ভ, অহংকার দলটাকে ধ্বংস করল।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ২৩ দিনে সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান এবং অগণিত মানুষ আহত হন। অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বা দৃষ্টিশক্তি হারান। মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, নাইমা সুলতানাসহ নিহতদের নামও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

/এসএন