সাম্প্রতিক সময়ে অল্প ব্যবধানে পরপর কয়েকটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ৬ থেকে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হলে রাজধানীর অসংখ্য ভবন ধসে পড়তে পারে। এতে প্রাণহানির সংখ্যা ৩ থেকে ৪ লাখে পৌঁছাতে পারে এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সম্ভাব্য বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক দুর্বল ভবনের নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকির ঘাটতি। প্রকৌশলবিদ্যায় বহুল প্রচলিত একটি বক্তব্য উল্লেখ করে তারা বলেন, ‘ভূমিকম্প মানুষকে হত্যা করে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে হত্যা করে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। কম্প্রিহেনসিভ আর্থকোয়াক ক্যাটালগ (কমক্যাট) এবং অন্যান্য সংস্থার তথ্য বলছে, প্রতি বছর গড়ে ৭ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ১৫ থেকে ১৬টি বড় ভূমিকম্প ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের মাত্রা (Magnitude) এবং তীব্রতা (Intensity) এক বিষয় নয়, তবে দুটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। মাত্রা ও তীব্রতা উভয়ই বেশি হলে ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতিকে এর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ এমন একটি ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবসময় বিদ্যমান। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা পুনরাবৃত্তির চক্র রয়েছে, যা সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পরপর দেখা যায়।
ইতিহাস বলছে, ১৭৬২ সালে আরাকান অঞ্চলে প্রায় ৮ মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। তবে এই তথ্যের অর্থ এই নয় যে, এখনই ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হবে। এমন ঘটনা কখন ঘটতে পারে, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৮৬৯ সালে আসামের কাছাড়ে ৭ দশমিক ৫, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল আর্থকোয়েক ৭ দশমিক ১, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৫০ থেকে ২০০ বছরের চক্র বিবেচনায় বাংলাদেশে ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প যেকোনো সময় ঘটতে পারে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের চারপাশে বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাউকি ফল্ট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া প্লেট বাউন্ডারি-১ (আরাকান ফল্ট), প্লেট বাউন্ডারি-২ (নোয়াখালী থেকে সিলেট) এবং প্লেট বাউন্ডারি-৩ (সিলেট থেকে কাছাড়)—এই সক্রিয় ফল্টগুলো একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তা মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জাইকা এবং সিডিএমপির এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। তবে কোন কোন ভবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, সেই তালিকা এখনো নির্দিষ্ট করা হয়নি।
তিনি জানান, রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখই ছোট ভবন, টিনশেড কিংবা বস্তি, যেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রাণহানির ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অবশিষ্ট প্রায় ৬ লাখ বহুতল পাকা ভবন, যেগুলোর অধিকাংশই চারতলার বেশি। প্রাথমিক মূল্যায়নে এসব ভবনের অন্তত ৪০ শতাংশকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তকরণ, নির্মাণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রস্তুতির মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
/এসএন