একসময় পবিত্র ঈদুল আজহায় হামিদুল হকদের বাড়িতে নিয়মিত গরু কোরবানি দেওয়া হতো। তবে গত তিন বছর ধরে সেই জায়গা দখল করেছে মহিষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার বাসিন্দা হামিদুল হক জানান, তাঁদের পরিবারের এখন কোরবানির জন্য প্রথম পছন্দ মহিষ।
এবারও হামিদুল হকের বাবা ও তাঁর চার ভাই মিলে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে একটি মহিষ কিনেছেন। হামিদুল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবার কোরবানির জন্য মহিষই বেশি পছন্দ। গরুর তুলনায় মহিষের মাংস বেশি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ মনে হওয়ায় তাঁরা প্রতি বছর মহিষ কোরবানি দিচ্ছেন।
শুধু হামিদুল হকের পরিবার নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন অনেকেই গরুর পরিবর্তে কোরবানির জন্য মহিষ বেছে নিচ্ছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের কোরবানির জন্য দেশে প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯টি মহিষ।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে কোরবানির জন্য গরু ও ছাগলের জনপ্রিয়তা বেশি হলেও ধীরে ধীরে মহিষের চাহিদাও বাড়ছে। বিশেষ করে মহিষের মাংসে তুলনামূলক কম ফ্যাট ও কোলেস্টরল থাকায় স্বাস্থ্যসচেতন অনেকেই এখন মহিষের দিকে ঝুঁকছেন।
কোরবানির মহিষ এবার বিদেশেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামের একটি এলবিনো মহিষ ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। মহিষটির মাথার সামনের চুলের ধরন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের সঙ্গে মিল থাকায় এমন নাম রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকার এক ক্রেতা মহিষটি কিনে নিয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শাহজামান খান প্রথম আলোকে বলেন, মহিষের মাংস তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত। এতে ফ্যাট ও কোলেস্টরল কম, মিনারেল বেশি এবং স্বাদও ভালো। এসব কারণে মহিষ কোরবানি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটেও এবার মহিষের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ চোখে পড়েছে। গত শনিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কেরানীগঞ্জ থেকে আনা ‘টাইগার’ নামের প্রায় এক টন ওজনের একটি মহিষ ঘিরে উৎসুক মানুষের ভিড়। খামারি মজিবর রহমান মহিষটির দাম হাঁকছিলেন ২৫ লাখ টাকা। সঙ্গে বিনা মূল্যে একটি ছোট আকারের ভুট্টি গরু দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
মহিষ কিনেছেন—এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাতজন মিলে ভাগে মহিষ কোরবানি দিচ্ছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার জুয়েল হোসেন স্থানীয় একটি পশুর হাট থেকে ২ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি মহিষ কিনেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহিষ কেনার ভিডিও লাইভও করেছেন।
জুয়েল হোসেন বলেন, সাতজন মিলে এবার মহিষ কোরবানি দিচ্ছেন। এর আগেও তাঁরা মহিষ কোরবানি দিয়েছেন। গরুর তুলনায় মহিষের দাম কিছুটা বেশি হলেও সবার পছন্দ মহিষ। তবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে তাঁরা গরু কেনেন।
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তোষপুর এলাকার বাসিন্দা মাকসুদুর রহমান একজন খামারি। তিনি গরু, মহিষ ও ভেড়া পালন করেন। এবার কোরবানিতে তিনি ছয়টি মহিষ বিক্রি করেছেন।
মাকসুদুর রহমান জানান, তিনি নিজেও চাচা ও চাচাতো ভাইদের সঙ্গে মিলে মহিষ কোরবানি দেবেন। তাঁর ভাষায়, গরু ও ভেড়ার তুলনায় মহিষে মাংস বেশি পাওয়া যায়। পাশাপাশি মহিষের মাংসে অ্যালার্জির সমস্যাও তুলনামূলক কম হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, যেসব এলাকায় চারণভূমি ও জলাভূমি বেশি, সেসব অঞ্চল মহিষ পালনের জন্য উপযোগী। ভোলা, নোয়াখালী, বাগেরহাট, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চল—যেমন টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম—এবং সিলেটে বেশি মহিষ পালন করা হয়।
চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ভোলার কয়েকজন খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও মহিষের বিক্রি ভালো হলেও কোথাও চাহিদা তুলনামূলক কম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার খামারি মো. তারেকুল্লাহ এবারের ঈদে বিক্রির জন্য ৪৫টি মহিষ প্রস্তুত করেছিলেন। সোমবার দুপুর পর্যন্ত তাঁর ৩৭টি মহিষ বিক্রি হয়েছে। তিনি জানান, সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকায় মহিষ বিক্রি করেছেন। সরাইল এলাকায় মহিষ কেনার আগ্রহ বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে ভোলার খামারি আবুল কাশেম মাস্টার বলেন, তুলনামূলক কম দাম হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রস্তুত করা খুব বেশি মহিষ বিক্রি হয়নি। ভোলার মানুষ এখনো খুব বেশি মহিষ কোরবানি দেন না বলেই তিনি মনে করেন। এ কারণে তিনি নিজের মহিষ চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিক্রির জন্য পাঠান।
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মৃন্ময় ভৌমিক বলেন, সন্দ্বীপের পশুর হাটে এবার প্রচুর মহিষ উঠেছে। এ অঞ্চলের মানুষের মহিষের মাংসের প্রতি আগ্রহও বেশি। ফলে কোরবানিতে মহিষের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।