আর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যায় হাড়ের জোড়ায় তীব্র ব্যথা, ফোলাভাব ও আড়ষ্টতা দেখা দেয়। যারা এ রোগে ভুগছেন, তারাই জানেন এর যন্ত্রণা কতটা কষ্টদায়ক।
যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ২৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত। অস্টিওআর্থ্রাইটিস (OA) কিংবা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (RA)—উভয় ধরনের রোগই স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়িয়ে প্রাকৃতিক কোনো উপায়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে উঠে এসেছে রান্নায় ব্যবহৃত পরিচিত মসলা জাফরান বা স্যাফরন।
কেন জাফরান নিয়ে আশাবাদী গবেষকরা?
আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় সাধারণত চিকিৎসকেরা ‘ডিজিজ-মডিফাইং অ্যান্টি-রিউম্যাটিক ড্রাগস’ (DMARDs) ব্যবহার করেন। এসব ওষুধ প্রদাহ কমাতে সহায়তা করলেও শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জাফরানের শক্তিশালী প্রদাহবিরোধী ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় এটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানের গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল
জাফরান নিয়ে গবেষণায় ইরানের বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। দেশটির গবেষকেরা জাফরানভিত্তিক ভেষজ ওষুধ ‘ক্রোসিনা’ (Krocina) নিয়ে ২০২০ ও ২০২২ সালে পরীক্ষা চালান। অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের ওপর পরিচালিত এসব পরীক্ষায় কয়েকটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা রেগুলেটরি টি-সেল (Tregs) এবং GATA-3 জিনের এক্সপ্রেশন বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে রোগীদের রক্তে সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিনের (CRP) মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
শুধু অস্টিওআর্থ্রাইটিস নয়, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রেও জাফরানের সম্ভাব্য কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০২০ সালে ইরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের একটি গবেষণায় দেখা যায়, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীরা দিনে ১০০ মিলিগ্রাম জাফরানের নির্যাস টানা ১২ সপ্তাহ সেবন করলে জয়েন্টের ফোলাভাব ও ব্যথার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের একটি রিভিউ রিপোর্টেও রিউমাটয়েড ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় জাফরানের সম্ভাবনাকে ‘যুগান্তকারী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
জাফরানের উপাদান ক্রোসিন নিয়েও গবেষণা
জাফরানের কার্যকারিতা নিয়ে চীনা বিজ্ঞানীদের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইনফ্লামেশন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়, জাফরানের অন্যতম প্রধান উপাদান ‘ক্রোসিন’ (Crocin) অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমিয়ে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের উপসর্গ উপশমে ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালে চীনের হেবেই প্রদেশে পরিচালিত একটি গবেষণায় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ক্রোসিনকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন
তবে জাফরানের সম্ভাব্য কার্যকারিতা নিয়ে সব গবেষকের অবস্থান এক নয়। ফরাসি ও গ্রিক গবেষকেরা জাফরানের গুণাগুণ স্বীকার করলেও এ বিষয়ে বিদ্যমান গবেষণার তথ্যগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন।
২০২১ সালে গ্রিক বিজ্ঞানীদের প্রকাশিত একটি সিস্টেমেটিক রিভিউতে বলা হয়, ইরানে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোতে পক্ষপাত বা বায়াস থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের মতে, বাতের চিকিৎসায় জাফরানের প্রকৃত কার্যকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে আরও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, বিভিন্ন গবেষণায় জাফরান ও এর উপাদান ক্রোসিনের ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা উঠে এলেও আর্থ্রাইটিসের নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে এর কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠার জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
/এসএন