• ঢাকা
  • রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০২ এএম


ঝুঁকিতে বিশ্ব, এখন বাঁচার উপায় মাত্র একটি!

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৩০ জুলাই ২০২৬ ৬:২৪ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (২৯ জুলাই) সর্বশেষ হামলার পরও পরিস্থিতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলেনি। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক শান্তি প্রতিষ্ঠার আশায় ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারকের (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) ওপর ভরসা করেছিলেন, সেটিও শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। ফলে এখন ওয়াশিংটনের সামনে দুটি কঠিন পথই যেন খোলা রয়েছে—একদিকে স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে শত শত মার্কিন সেনার জীবন ঝুঁকিতে ফেলা, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া।বিশ্লেষকদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে “ভালো কোনো বিকল্প নেই” কথাটি প্রায় বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর এশিয়া এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক লাইল গোল্ডস্টেইন বলেন, “আমরা সত্যিই একটি কঠিন সংকটে পড়েছি।”বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে যুদ্ধের প্রভাবইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহলের ওপর নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে।বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য অকার্যকর থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এতে তেলের মজুত কমে যাওয়ার পাশাপাশি ডিজেল, সারসহ তেলনির্ভর বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে আগামী শীতে ইউরোপে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংকটের আশঙ্কাও রয়েছে।এদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন ও প্রবাসী বিনিয়োগের পরিবেশও যুদ্ধের কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। মূল্যস্ফীতির নতুন চাপের মুখে পড়েছে ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতিগুলোও।ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধাক্কাযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বুধবার প্রকাশিত সিএনএন/এসএসআরএস জরিপে দেখা গেছে, ইরান নীতি এবং জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন ৩০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে।বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প ভোটারদের সমর্থন পেয়েছিলেন, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।সমাধানের পথ কূটনীতিতেইবিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই এই সংঘাতের অবসান সম্ভব। এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা হতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত পরাজয় স্বীকার না করেও সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। একই সঙ্গে ইরানও দাবি করতে পারবে যে তারা যুদ্ধের পর নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।তবে এমন সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে।এমন পরিস্থিতিতে নতুন একটি প্রস্তাবও সামনে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করতে পারে এবং এর অর্থনৈতিক সুবিধা ভাগাভাগি করতে পারে।উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভেস্তে যাওয়া সমঝোতা স্মারকেও ইরান, ওমান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নির্ধারণের কথা উল্লেখ ছিল।এদিকে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আবারও সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনাবর্তমানে প্রকাশ্যে চলমান একমাত্র কূটনৈতিক উদ্যোগ হলো ইরান ও ওমানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা। সেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে জাহাজ চলাচল কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।জানা গেছে, ইরান তেলবাহী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি আরোপের পক্ষে থাকলেও ওমান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে “সামুদ্রিক সেবা ফি” নামে একটি সমঝোতার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।লন্ডনভিত্তিক বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের এক বিশ্লেষণে “হরমুজ ফি” ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। এটি সরাসরি টোল নয়; বরং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি আর্থিক অবদান হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রস্তাবটি মালাক্কা প্রণালির যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেলের আদলে হতে পারে, যেখানে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অংশ নেয়।বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের রটারডাম বন্দরের মতো প্রতি গ্রস মেট্রিক টনে প্রায় ০.০৮ ডলার হারে ফি নির্ধারণ করা হলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় হতে পারে। এমনকি ব্যারেলপ্রতি কয়েক ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ও বর্তমান অস্থিতিশীল বাজারের তুলনায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কারণ যুদ্ধের প্রভাবে একদিনেই তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।এই বিশ্লেষণের অন্যতম লেখক এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজ বলেন, ইরানের মূল লক্ষ্য শুধু অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তেল রপ্তানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারই তাদের বড় স্বার্থ হতে পারে।বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের মার্কিন প্রশাসনগুলো এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক সহায়তা নিলেও ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, কঠোর অবস্থান এবং ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে এখন সেই সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সামরিক অভিযান শুরুর আগে অনেক মিত্র দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র পর্যাপ্ত পরামর্শ করেনি।জার্মান মার্শাল ফান্ডের ব্রাসেলসভিত্তিক বিশ্লেষক ইয়ান লেসার বলেন, “ইউরোপকে কোনো কৌশলে সহায়তা করতে বলা এক বিষয়, কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলটাই স্পষ্ট নয়।”অন্যদিকে এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজের মতে, তেহরান ওমানের প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সময় ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সহজে ছেড়ে দেবে না। তার ভাষায়, ইরান শেষ পর্যন্ত প্রণালিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে, কারণ সেটি তাদেরও স্বার্থে। তবে তারা তখনই তা করবে, যখন তাদের মনে হবে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শিক্ষা পেয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কোনো সমঝোতা হলেও তা বর্তমান সংকটের একটি অংশের সমাধান করবে মাত্র। ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ তখনও বহাল থাকবে।তবু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সামরিক ও রাজনৈতিক বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে আসায় শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষকেই কোনো না কোনো সমঝোতার পথ বেছে নিতে হতে পারে। অন্যথায় এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য শুধু দুই দেশ নয়, গোটা বিশ্বকেই আরও দীর্ঘ সময় ধরে বহন করতে হবে।

/বিএসএস