ছবি: সংগৃহীত
লেবাননে ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় সোমবার (১ জুন) দুই নেতার মধ্যে হওয়া এক উত্তপ্ত ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর উদ্দেশে অশালীন ভাষাও ব্যবহার করেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
অ্যাক্সিওস দুটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ওই ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলে অভিহিত করেন এবং তার বিরুদ্ধে অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ তোলেন। একই সঙ্গে বৈরুতে হামলার জন্য ইসরাইলের যে পরিকল্পনা ছিল, তাতে আপাতত লাগাম টানার উদ্যোগও নেন তিনি।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেন, লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বোমাবর্ষণের হুমকি বাস্তবায়ন করা হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
অ্যাক্সিওসের সঙ্গে কথা বলা দুটি সূত্র আরও জানায়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তার সহায়তাতেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এখনও কারাগারের বাইরে আছেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলার সময় তাকে দেওয়া সমর্থনের প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের সারমর্ম তুলে ধরে ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুকে বলেছেন, ‘তুমি বদ্ধ উন্মাদ (ইউ আর ফাকিং ক্রেজি)। আমি না থাকলে তোমাকে জেলে পচতে হতো। আমিই তোমাকে বাঁচাচ্ছি। এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এসবের জন্য সবাই এখন ইসরাইলকেও ঘৃণা করে।’
এ আলোচনার বিষয়ে অবগত আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ফোনালাপের সময় ট্রাম্প অত্যন্ত বিরক্ত ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি নেতানিয়াহুর ওপর চিৎকার করে বলেন, ‘তুমি করছটা কী?’
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের ধারণা হয়েছে যে নেতানিয়াহু প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি এবং অযৌক্তিকভাবে আগ্রাসী অবস্থান গ্রহণ করছেন।
লেবাননে ইসরাইলের অভিযান নিয়ে উদ্বেগ
ফোনালাপের আগে ট্রাম্প অবগত ছিলেন যে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছিল এবং আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছিল। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নেতানিয়াহু পরিস্থিতিকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত করে তুলছেন বলে ট্রাম্প মনে করেন।
এদিকে ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে তাদের স্থল অভিযানও সম্প্রসারণ করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, লেবাননে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চলমান আলোচনাকে ভেস্তে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও তার মধ্যে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আরও জানান, একজন হিজবুল্লাহ কমান্ডারকে লক্ষ্য করে পুরো একটি ভবন ধ্বংসের পরিকল্পনারও বিরোধিতা করেছিলেন ট্রাম্প। কারণ, এমন হামলায় সাধারণ লেবানিজ নাগরিকদের প্রাণহানির ঝুঁকি ছিল।
ফোনালাপের পর এক ইসরাইলি কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানান, বৈরুতে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সম্পর্ক: ঘনিষ্ঠতা ও মতবিরোধ
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যদিও বিভিন্ন সময়ে তাদের মধ্যে প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা দেখা গেছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে একাধিকবার মতবিরোধ ও উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। ইরানসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তারা একসঙ্গে কাজ করলেও অতীতে বেশ কয়েকটি কঠিন ফোনালাপ হয়েছে।
তবে অ্যাক্সিওসের দাবি, গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের পর নেতানিয়াহুর সঙ্গে এটিই ছিল সবচেয়ে খারাপ ফোনালাপগুলোর একটি।
ফোনালাপের পর ট্রাম্প যা বললেন
ফোনালাপ শেষে ট্রাম্প সেটিকে ‘ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, ইসরাইলি সেনারা বৈরুতের দিকে আর অগ্রসর হবে না।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি আজ বিবির (নেতানিয়াহু) সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাকে বৈরুতে বড় ধরনের অভিযান না চালানোর অনুরোধ করেছি। তিনি সেনাদের ফিরিয়ে নিয়েছেন। ধন্যবাদ, বিবি!’
ট্রাম্প আরও বলেন, তিনি হিজবুল্লাহ নেতাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তাদের পক্ষ থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করার আশ্বাস পাওয়া গেছে। একইভাবে ইসরাইলও হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
নেতানিয়াহুর ভিন্ন ব্যাখ্যা
অন্যদিকে নেতানিয়াহুও ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তার দাবি, এটি কোনো চাপ প্রয়োগের ঘটনা ছিল না। বরং তিনি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ হামলা অব্যাহত রাখলে বৈরুতের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হবে।
নেতানিয়াহু আরও বলেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনাবাহিনী পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের অভিযান চালিয়ে যাবে।
এ বিষয়ে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
/এইচটি