• ঢাকা
  • বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৯ এএম


যুদ্ধের প্রভাব ধানক্ষেতে, সার সংকটে এশিয়াজুড়ে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালি বন্ধ, চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা! খাদ্য সংকটে পড়তে পারে এশিয়া

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ মে ২০২৬ ৮:৪০ পিএম

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ধানক্ষেতে যখন নতুন মৌসুমের চাষাবাদ শুরু হওয়ার কথা, তখন থাইল্যান্ডের চাচোয়েংসাও প্রদেশের ৬০ বছর বয়সী কৃষক সুচার্ট পিয়ামসোমবুন স্থানীয় দোকানে গিয়েছিলেন সার কিনতে।

কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সার এখনো এসে পৌঁছায়নি।

দোকানদার তাকে আরও বলেন, সার আদৌ আসবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। আর এলেও প্রতি বস্তার দাম হবে ১ হাজার ১০০ বাথের বেশি। মাত্র এক মাস আগেও যার দাম ছিল ৮০০ থেকে ৯০০ বাথ।

পিয়ামসোমবুন বাড়ি ফেরার আগেই এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ে, সারের দাম আরও বেড়ে ১ হাজার ২০০ বাথ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এ অবস্থায় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার আর চাষ করবেন না।

তিনি বলেন, “চাষাবাদ করলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয়। এর চেয়ে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ বাথ আয় করাই ভালো। খরচ কমছে না, অথচ আয় ক্রমেই কমছে।”

পিয়ামসোমবুন একা নন।

থাইল্যান্ডের ধান উৎপাদন অঞ্চল থেকে শুরু করে ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টা পর্যন্ত এশিয়ার কৃষকেরা এখন একই হিসাব কষছেন এবং একই কঠিন সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছেন। চাষের মৌসুম শুরু হলেও প্রয়োজনীয় সার নেই।

আর আগামী কয়েক সপ্তাহে কৃষকেরা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই ঠিক করবে বছর শেষে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদন অঞ্চলগুলো কতটা ফলন দিতে পারবে।

হরমুজ বন্ধ, এরপর চীনের সিদ্ধান্ত

এই সংকটের মূল কারণ এমন একটি যুদ্ধ, যেটি নিয়ে এ অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষকের আগে খুব বেশি আগ্রহ ছিল না।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর কার্যত বন্ধ হয়ে যায় হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

বিশ্বের অনেক দেশই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করে।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইউরিয়ার দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। ইউরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত নাইট্রোজেনভিত্তিক সার।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বের দৃষ্টি যায় চীনের দিকে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার উৎপাদনকারী দেশ।

গত বছর বৈশ্বিক সারের মোট উৎপাদনের ২৫ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। একই বছরে দেশটি ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সার রপ্তানি করেছে।

কিন্তু চীনও নিজেদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। মার্চ মাসে দেশটি কৃষিখাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েক ধরনের সারের রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। এর আগে ২০২১ সাল থেকেই ধাপে ধাপে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছিল।

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে চীনের মোট সারের রপ্তানির ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধতার আওতায় রয়েছে।

চীনের শানডং প্রদেশের এক সার রপ্তানিকারক, যিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, জানান যে সরকার থেকে রপ্তানি বন্ধের নির্দেশ পেয়েছেন তিনি।

গত কয়েক বছর ধরে তার আমদানি-রপ্তানি প্রতিষ্ঠান থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সার রপ্তানি করছিল।

তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে অন্তত “পাঁচ-ছয়টি দেশের” সঙ্গে তাদের চুক্তি স্বাক্ষরিত ছিল এবং জাহাজ পাঠানোর তারিখও নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

তার ভাষায়, “আমরা ইতোমধ্যে অর্ডার পেয়েছিলাম। ক্রেতারা অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু এখন আমাদের বলা হয়েছে, কোনো চালান পাঠানো যাবে না।”

তিনি আরও বলেন, “অবশ্যই ব্যবসা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। তবে সরকার কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আমরা বুঝতে পারছি। সরকার দেশে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়, তাই আমরা নিয়ম মেনে চলব।”

বর্তমানে চীন যে সারটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রপ্তানি করছে, সেটি হলো অ্যামোনিয়াম সালফেট। এটি তুলনামূলক নিম্নমানের শিল্পজাত উপজাত, যা ধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সারের কার্যকর বিকল্প নয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো এমেরিটাস জোসেফ গ্লাউবার বলেন, “চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব বৈশ্বিক সারবাজার ও খাদ্য নিরাপত্তাকে অনিবার্যভাবেই নাড়িয়ে দেবে।”

চীন কেন রপ্তানি বন্ধ করছে?

চীনের নেতৃত্ব খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে দেশের রাজনৈতিক নীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে। ২০২৩ সালে পাস হওয়া দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা আইনে স্থানীয় সরকারগুলোকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যেই খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে।

বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার সময় যদি সার বিদেশে রপ্তানি করা হয়, তাহলে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম বাড়বে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দেশটির কৃষকেরা, যাদের সুরক্ষার জন্যই এই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

সিঙ্গাপুরের খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সিনিয়র ফেলো অধ্যাপক পল তেং বলেন, “চীনে খাদ্য নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। নিজেদের জনগণের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করার প্রশ্নে সরকার কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়।”

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় নাইট্রোজেনভিত্তিক সার উৎপাদনের মূল উপাদান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার ক্ষেত্রেও চীনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

কারা সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?

চীনের সারের ওপর কাঠামোগতভাবে নির্ভরশীল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ওপর বেইজিংয়ের সিদ্ধান্ত বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

ভিয়েতনাম বিশ্বের অন্যতম প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশ। ফিলিপাইনসহ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দেশটি চাল সরবরাহ করে।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ভিয়েতনামের মোট সার আমদানির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে চীন থেকে। পরিমাণে যা ৪ লাখ ৮০ হাজার টনের বেশি।

অর্থাৎ, যে দেশ পুরো অঞ্চলের খাদ্য জোগায়, সেই দেশটিই নিজেদের ক্ষেতের জন্য চীনা সারের ওপর নির্ভরশীল।

ফিলিপাইনের পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটি ৭৫ শতাংশ সারের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল এবং বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের মতো উল্লেখযোগ্য নিজস্ব উৎপাদনও নেই।

এদিকে দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ চাল আমদানি আসে ভিয়েতনাম থেকে।

ফলে পুরো সরবরাহব্যবস্থাটি এক সরল নির্ভরতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ— ফিলিপাইনের ভোক্তারা নির্ভর করেন ভিয়েতনামের চালের ওপর, আর ভিয়েতনামের কৃষকেরা নির্ভর করেন চীনের সারের ওপর। এই শৃঙ্খলের একটি অংশ ভেঙে গেলেই পুরো ব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হতে পারে।

এশিয়ার অন্যতম কৃষিশক্তি থাইল্যান্ডও ২০২৪ সালে তাদের মোট সারের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ চীন থেকে আমদানি করেছে। পাশাপাশি দেশটির মোট সারের ৩২ শতাংশ এসেছে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। এখন এই দুই উৎসই একসঙ্গে সংকটে পড়েছে।

যে ফসল হয়তো আর আসবে না

এই সংকটের প্রভাব এখনই খাদ্যের দামে দেখা যাবে না— না এই সপ্তাহে, না আগামী মাসে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে বছরের শেষে। কারণ এ বসন্তে যেসব জমিতে চাষ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে হয়তো স্বাভাবিকের তুলনায় কম ফলন হবে, কিংবা কোনো ফলনই হবে না।

অধ্যাপক পল তেং বলেন, “বিভিন্ন দেশের হাতে হয়তো তাৎক্ষণিক চাষ মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সার মজুত আছে। কিন্তু সংকট যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে ধানের মতো ফসলের ওপর এর প্রভাব দেখা যাবে।”

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ধারণা করছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সম্মিলিত প্রভাবে ২০২৬ সালে অতিরিক্ত ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্য অনিরাপত্তা ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় সর্বোচ্চ।

ব্যাংককের নং চোক জেলার ৪৮ বছর বয়সী কৃষক প্রাথুয়াং পিয়ামসোমবুন বলেন, “অনেক সময় আমার মনে হয়, দেশের সব ধানচাষি যদি একসঙ্গে চাষ বন্ধ করে দিত, তাহলে সরকারের খাওয়ার মতো চাল থাকত না, আর তখন তারা বুঝতে পারত আমরা কী অবস্থার মধ্যে আছি।”

তিনি বলেন, “এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।”

সূত্র: বিবিসি