কিম জু অ্যের ফ্যাশনে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার বার্তা
২০২২ সালের নভেম্বরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের পাশে এক স্মার্ট পোশাক পরা কিশোরীর ছবি প্রকাশ্যে আসে। সে ছিল তার মেয়ে কিম জু অ্যে।
একটি বিশাল আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে বাবার পাশে হাঁটতে দেখা যায় তাকে। তখন তার পরনে ছিল কালো প্যান্ট ও সাদা প্যাডেড জ্যাকেট, আর লম্বা চুল বাঁধা ছিল পেছনে।
রাষ্ট্রীয় প্রচারণামাধ্যমে এটিই ছিল জু অ্যের প্রথম উপস্থিতি। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু সেই বয়সেই তার পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল অত্যন্ত পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দন।
এরপর থেকে তার চুলের সাজ আরও জটিল ও আকর্ষণীয় হয়েছে। একইসঙ্গে তার পোশাকও হয়ে উঠেছে আরও অভিজাত ও পরিশীলিত।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, এত অল্প বয়সেই যেভাবে জু অ্যের গুরুত্ব বাড়ছে, তাতে কিম জং উন তাকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
বর্তমানে তার বয়স ১৩ বছর বলে ধারণা করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক কুচকাওয়াজ এবং বিদেশ সফরে বাবার সঙ্গে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে তাকে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, জু অ্যের ফ্যাশন— বিশেষ করে চামড়ার পোশাক, পশমের কোট এবং তথাকথিত “রুস্টার” হেয়ারস্টাইল— ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাকে দেশ পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ধারণা করা হয়, জু অ্যের পোশাক নির্ধারণ করে উত্তর কোরিয়ার সরকারের প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড অ্যাজিটেশন ডিপার্টমেন্ট।
অনেক সময় তাকে মায়ের মতো আনুষ্ঠানিক স্যুট ও স্কার্ট পরে দেখা গেছে। তার মা রি সল জুও একই ধরনের পোশাক পরেন।
সেজং ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক চেওং সিয়ং-চ্যাং বিবিসি কোরিয়াকে বলেন, “জু অ্যে এখনও খুবই ছোট। ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে তার বয়সকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতে পারে। তাই তাকে মায়ের মতো আনুষ্ঠানিক পোশাক পরানো হচ্ছে, যাতে তার কম বয়স আড়াল করা যায় এবং আরও পরিণত একটি ভাবমূর্তি তুলে ধরা যায়।”
আবার অন্য সময় তাকে চামড়ার জ্যাকেট পরেও দেখা গেছে। চেওংয়ের ভাষায়, এটি এমন পোশাক যা “একইসঙ্গে শক্তিশালী ভাবমূর্তি ও স্বাভাবিকতা প্রকাশ করে” এবং সামরিক ঘাঁটির মতো “রুক্ষ বা কঠিন পরিবেশে” যাওয়ার জন্য উপযোগী।
এর ফলে অনেক সময় তার পোশাক কিম জং উনের সঙ্গেও মিল হয়ে যায়। কিম নিজেও কালো চামড়ার জ্যাকেট ও ট্রেঞ্চ কোট পরতে পছন্দ করেন।
পূর্ববর্তী প্রজন্মের ফ্যাশনের প্রতিফলন ঘটানো বা “ইমেজ রিপ্লিকেশন” উত্তর কোরিয়ার নেতাদের ক্ষমতা ধরে রাখার একটি পুরোনো কৌশল।
ক্ষমতার শুরুর দিকে কিম জং উনও নিজের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য তার দাদা কিম ইল সুংয়ের মতো পোশাক পরতেন।
কিম ইল সুং ৪৫ বছরের বেশি সময় উত্তর কোরিয়া শাসন করেন এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটিতে তাকে প্রায় দেবতার মতো মর্যাদা দেওয়া হয়।
চেওং বলেন, “প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড অ্যাজিটেশন ডিপার্টমেন্ট এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, যার মাধ্যমে কিম ইল সুংয়ের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা স্বাভাবিকভাবেই কিম জং উনের দিকে স্থানান্তরিত হয়।”
তিনি আরও বলেন, “কিম জং উন প্রথম জনসমক্ষে এলে উত্তর কোরিয়ার মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞরাও অবাক হয়েছিলেন, কারণ তরুণ কিম জং উনকে দেখতে অনেকটাই তরুণ কিম ইল সুংয়ের মতো লাগছিল।”
“উত্তরসূরি হিসেবে বয়স ও অভিজ্ঞতার ঘাটতির মতো সীমাবদ্ধতাগুলো কেবল কিম ইল সুংয়ের সঙ্গে তার সাদৃশ্যের কারণেই অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল।”
“এমনকি উত্তর কোরিয়ায় গুজবও ছড়িয়ে পড়ে যে কিম ইল সুং পুনর্জন্ম নিয়েছেন।”
বিশ্লেষকদের মতে, জু অ্যের বৈধতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক পরার মাধ্যমে জু অ্যে ও রি সল জু এক ধরনের “পার্থক্য তৈরির কৌশল”ও অনুসরণ করছেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যে তাদের সামাজিক অবস্থান সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা।

চেওং বলেন, জু অ্যেকে একাধিকবার চামড়ার জ্যাকেট পরতে দেখা যাওয়ায় বোঝা যায়, সরকার তার মর্যাদাকে সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে উঁচুতে তুলে ধরতে চায়।
তার ভাষায়, “উচ্চমানের চামড়ার পোশাক পরা বিশেষ মর্যাদা প্রদর্শনের একটি উপায়।”
“উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে চামড়ার পোশাক খুব বেশি দেখা যায় না। বিলাসবহুল ব্র্যান্ড, চামড়ার জ্যাকেট ও পশমের কোট এমন পোশাক, যা সাধারণ মানুষ পরতে পারে না।”
জু অ্যের এই পরিবর্তিত ফ্যাশন দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তে থাকা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
২০২০ সালে উত্তর কোরিয়া “রিঅ্যাকশনারি আইডিওলজি অ্যান্ড কালচার রিজেকশন অ্যাক্ট” চালু করে, যার লক্ষ্য ছিল “বহিরাগত সংস্কৃতি” ঠেকানো।
তবে ২০২৩ সালে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি আবারও একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে বাবার পাশে হাঁটতে দেখা যায় জু অ্যেকে। তখন তার পরনে ছিল একটি কালো প্যাডেড জ্যাকেট, যা পরে ফরাসি বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের ১ হাজার ৯০০ ডলারের পণ্য হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
পরের বছর পিয়ংইয়ংয়ের একটি আবাসন প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জু অ্যে একটি আংশিক স্বচ্ছ ব্লাউজ পরেছিলেন, যাতে তার বাহু দেখা যাচ্ছিল।
এরপর সাধারণ নাগরিকদের জন্য একটি ভিডিও লেকচার প্রকাশ করা হয়। সেখানে সতর্ক করা হয় যে, এ ধরনের চুলের স্টাইল ও পোশাক তারা পরতে পারবে না, কারণ এগুলো “সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে এমন সমাজবিরোধী ও অ-সমাজতান্ত্রিক আচরণ, যা নির্মূল করা প্রয়োজন”।
রেডিও ফ্রি এশিয়াকে এক স্থানীয় সূত্র এ তথ্য জানায়।
এই ঘটনাগুলো আবারও সামনে এনেছে যে, প্রায় দেবতুল্য মর্যাদা পাওয়া কিম পরিবার অনেক সময় এমন নিয়মের বাইরে থাকে, যা সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে প্রযোজ্য।
ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক লি উ-ইয়ং বলেন, “পশ্চিমা ফ্যাশন হিসেবে জিন্স উত্তর কোরিয়ায় নিষিদ্ধ হলেও কিম জং উনকে জিন্স পরতে দেখা গেছে।”
তিনি বলেন, “বিদেশি সংস্কৃতি যতই নিষিদ্ধ করা হোক বা আইন করা হোক না কেন, উত্তর কোরিয়ায় সর্বোচ্চ নেতার পক্ষে অসম্ভব এমন কিছু নেই।”

তবু এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিম পরিবারের মতো স্টাইল অনুসরণের আগ্রহ কমেনি।
ধনী উত্তর কোরিয়ানদের মধ্যে শ্যানেল ব্র্যান্ডের প্রসাধনী ও পারফিউমের ব্যবহার বাড়ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। চীনের সীমান্তঘেঁষা একটি শহরে পশমের কোটও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
এছাড়া একটি অভিজাত কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের আংশিক স্বচ্ছ ব্লাউজ পরা ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে। একইসঙ্গে জু অ্যে ও কিম জং উনের মতো সানগ্লাস ও চামড়ার ট্রেঞ্চ কোট ধনী তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলেও জানা গেছে।
উত্তর কোরিয়ায় এমন ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও তরুণদের মধ্যে কিম জং উনের চুলের স্টাইল অনুসরণের খবর পাওয়া গিয়েছিল।
বাইরের বিশ্বের তথ্য ও ফ্যাশনধারার ওপর সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় দেশটির নেতাই অপ্রত্যাশিতভাবে এক ধরনের ফ্যাশন আইকনে পরিণত হয়েছেন।
এখন মনে করা হচ্ছে, তার মেয়েও সেই অবস্থানে পৌঁছে গেছেন।
সূত্র: বিবিসি