ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সময় দ্রুত বিজয়ের আশ্বাস দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump। যুদ্ধ শুরুর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর বাস্তব চিত্র ভিন্ন হয়ে উঠেছে। এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি, বরং সংঘাত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যা পুরো বিশ্বকে সংকটে ফেলেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম CNN-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাত এমন একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যেখানে স্পষ্ট কোনো বিজয়ী নেই। Brookings Institution-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো মেলানি সিসন বলেছেন, এই যুদ্ধে কেউ প্রকৃত অর্থে জয়ী হচ্ছে না, যদিও কিছু দেশ নিজেদের অবস্থান সামাল দিতে পারছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যাদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ৩৬০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৭০০ জন সাধারণ মানুষ।
ইরানের ভেতরেও পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ রেখে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। অর্থনীতিতেও তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে—মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, কর্মসংস্থান কমেছে এবং দারিদ্র্য আরও বাড়ছে।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের সংঘর্ষে লেবানন আবারও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের বিমান ও স্থল হামলায় ২৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং ৬ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এতে মানবিক সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো শুরুতে যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তাদেরও বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে United Arab Emirates ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। যদিও অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে, তবুও তাদের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে Strait of Hormuz বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়, যার প্রভাব পড়েছে Iraq, Qatar ও Kuwait-এর মতো দেশগুলোর ওপর।
এই যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়েছে। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চে তা ৩.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে এবং ভোক্তা আস্থা কমে যাচ্ছে, যা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই সংঘাতের প্রভাব স্পষ্ট। International Monetary Fund পূর্বাভাস দিয়েছে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সার ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বড় সংকটে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু করে বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি নিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এখনো তার ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ হয়নি। দেশে তার জনপ্রিয়তা কমছে এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধ চালানো নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu শুরুতে কিছু কৌশলগত সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধ তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশের ভেতরে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে হিজবুল্লাহর হামলার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমালোচনা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, বড় ক্ষয়ক্ষতির পরও ইরানের সরকার টিকে আছে এবং নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। Strait of Hormuz নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারছে, যা তাদের কৌশলগত শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
এই সংকটে China তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তারা আগেই তেলের মজুত বাড়িয়েছে এবং বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে নিজেদের শান্তিপন্থী শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।
উচ্চ তেলের দামের কারণে ExxonMobil, Shell ও BP-এর মতো বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো উল্লেখযোগ্য মুনাফা করছে। ২০২৬ সালে এই খাতে আয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে Russia-ও তেল ও গ্যাস বিক্রির মাধ্যমে লাভবান হচ্ছে, যদিও বৈশ্বিক অর্থনীতি দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জ্বালানি সংকট বিশ্বকে বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে, ফলে সৌর ও বায়ু শক্তির চাহিদা বাড়ছে। তবে কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে এই খাতেও কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বেড়েছে এবং অস্ত্র ও ড্রোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকতে পারে।
দুই মাস পর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এই সংঘাতে ক্ষতির পরিমাণই বেশি। কিছু দেশ বা খাত সাময়িকভাবে লাভবান হলেও সামগ্রিকভাবে বিশ্ব আরও অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ ও মানবিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে। মূলত এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই প্রকৃত বিজয়ী নয়—বরং সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত, তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
/এসএন