বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। পায়ে রয়েছে সমস্যা, ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারেন না। তবু জীবিকার তাগিদে থেমে থাকার সুযোগ নেই ৮০ বছর বয়সী আবদুল জব্বারের। প্রতিদিন গলায় গামলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সেই গামলায় থাকে ভাজা বাদামের ছোট ছোট প্যাকেট। হাট-বাজার, বিদ্যালয় কিংবা খেলার মাঠ—যেখানেই মানুষের সমাগম, সেখানেই দেখা মেলে তাঁর।
প্রায় তিন দশক ধরে বাদাম বিক্রি করেই সংসার চালিয়ে আসছেন জব্বার। বয়সের ভার কিংবা শারীরিক দুর্বলতা—কোনোটিই তাঁকে জীবিকার এই সংগ্রাম থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি।
আবদুল জব্বারের বাড়ি খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার ৫ নম্বর উল্টাছড়ি ইউনিয়নের ওমরপুর গ্রামে। তাঁর বাড়ি থেকে বাজারের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। প্রতিদিন এই পথ পাড়ি দিয়ে বাজারে আসেন তিনি। এরপর পানছড়ির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন বাদাম। দিন শেষে আবার হেঁটেই ফিরতে হয় বাড়িতে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ হাঁটেন প্রবীণ এই বাদাম বিক্রেতা।
জব্বারের প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততা শুরু হয় ভোরে। ঘুম থেকে উঠে নিজ হাতে চুলোয় বাদাম ভাজেন। এরপর পাল্লায় ওজন করে ২৮ গ্রাম করে ছোট ছোট প্যাকেট তৈরি করেন। গামছা দিয়ে গলায় গামলা ঝুলিয়ে সকাল আটটার আগেই বেরিয়ে পড়েন জীবিকার সন্ধানে। প্রখর রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়—প্রতিকূল আবহাওয়ার কোনো কিছুই সহজে তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না।
১০ টাকা দামের প্রতিটি বাদামের প্যাকেটই তাঁর আয়ের অন্যতম ভরসা। সারাদিন বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে অল্প অল্প করে বাদাম বিক্রি করেন তিনি। এভাবেই সামান্য আয় দিয়ে চালাতে হয় সংসার।
ওমরপুর গ্রামের একটি জরাজীর্ণ ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন আবদুল জব্বার। এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে তাঁর। ছেলে নিজের পরিবার নিয়ে লালমনিরহাটে থাকেন। নিজের সংসার চালাতেই তাঁকে হিমশিম খেতে হয়, ফলে বাবাকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। অন্যদিকে, মেয়ের বিয়ে হলেও তাঁর জামাই প্রতিবন্ধী। এমন পরিস্থিতিতে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে চলতে হচ্ছে জব্বারকে।
শারীরিকভাবে আগের মতো সক্ষমতা নেই তাঁর। দীর্ঘ পথ হাঁটতে গিয়ে কষ্ট হয়, কমে গেছে শরীরের বল ও শক্তি। কিন্তু জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই তাঁকে ঘর থেকে বের হতে হয়।
নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবদুল জব্বার বলেন, ‘শরীরে আর কুলায় না। অনেক কষ্ট হয়। এখন আর পারি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সারাদিন ঘুরেফিরে বাদাম বিক্রি করি। এতে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কিলোমিটার হাঁটা হয়। বয়স হয়েছে, বল-শক্তি কমে গেছে। তাই চলতেও কষ্ট হয়। বাদাম নিজেই ভাজি, নিজেই প্যাকেট করি। পাল্লায় ওজন করে ২৮ গ্রাম করে বাদাম দিই। সবার কাছে দোয়া চাই।’
আবদুল জব্বারের জীবনসংগ্রাম কেবল একজন বাদাম বিক্রেতার প্রতিদিনের পরিশ্রমের গল্প নয়; এটি বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার এক বাস্তব চিত্র। যে বয়সে স্বজনদের সান্নিধ্যে বিশ্রামে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেও গলায় গামলা ঝুলিয়ে জীবিকার সন্ধানে পথে পথে ঘুরতে হচ্ছে তাঁকে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জব্বারের কষ্টের জীবনকাহিনি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। জীবনের শেষ বয়সে তাঁর জন্য অন্তত কিছুটা স্বস্তি, নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে গলায় গামলা ঝুলিয়ে বাদাম বিক্রি করার এই কঠিন জীবনসংগ্রাম থেকে কিছুটা মুক্তি পাবেন প্রবীণ আবদুল জব্বার।
/এসএন