ইরানের চাবাহার বন্দর ঘিরে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভারতের আঞ্চলিক সংযোগ কৌশলের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত এই বন্দর প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক করিডর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি ছিল ভারতের মূল ভরসা।
ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত এই বন্দরে দুটি প্রধান টার্মিনাল রয়েছে—শহীদ কালানতরি ও শহীদ বেহেশতি। এর মধ্যে শহীদ বেহেশতি টার্মিনালের উন্নয়নে ভারত প্রায় ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
ভৌগোলিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতার কারণে ভারত সরাসরি স্থলপথে আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়ায় পৌঁছাতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে ইরানে পৌঁছে সেখান থেকে স্থলপথে পণ্য পরিবহনের জন্য চাবাহার ছিল সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প।
চাবাহার বন্দরের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গোয়াদার বন্দর—যা চীন-এর সহায়তায় পাকিস্তানে নির্মিত—তার পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে চাবাহারকে দেখছে ভারত।
গোয়াদার থেকে মাত্র প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাবাহার ভারতের জন্য ওই অঞ্চলে কৌশলগত উপস্থিতি বজায় রাখার একটি বড় সুযোগ তৈরি করে।
চাবাহার বন্দর আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডর-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডর ভারত, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগকে আরও সহজ করেছে। এর মাধ্যমে ইউরেশিয়ার বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে ভারতের জন্য।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-কে ঘিরে উত্তেজনা, নৌ অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালী এলাকায় অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভারতের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নয়াদিল্লির উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞা ছাড় পুনর্নবায়ন না করে, তাহলে এই প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট শুধু একটি বন্দর প্রকল্পকে নয়, বরং ভারতের আঞ্চলিক কৌশল, বাণিজ্যিক সংযোগ এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—ভারতের বহু প্রতীক্ষিত ‘চাবাহার স্বপ্ন’ কি থমকে যাবে, নাকি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নতুন কোনো সমাধান বের হবে? এখন সেটিই দেখার বিষয়।