• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম


সংসারের হাল ধরতে সৌদি গিয়েছিলেন নজরুল, মৃত্যুদণ্ডে নিঃস্ব পরিবার

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:০২ পিএম

‘শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে চাই’, সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ডে ভেঙে পড়েছে পরিবার

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি তরুণ নজরুল ইসলামের (২৫) মৃত্যুতে শোকের মাতম চলছে তাঁর পরিবারে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যরা। পুত্রশোকে মুহ্যমান বাবা আব্দুল বাছির। অন্যদিকে, কীভাবে সংসার চলবে, তা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন মা রহিমা বেগম। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।

জেলখানা থেকে প্রতি রোববার মাকে ফোন করতেন নজরুল। সর্বশেষ গত ১১ অক্টোবরও মা রহিমা বেগমের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। কিন্তু তখনও নজরুল জানতেন না, তিন দিন পরই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।

মসজিদ কম্পাউন্ডে বাংলাদেশি এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে নজরুলের শিরশ্ছেদ করা হয়। একই অভিযোগে সিতি আক্তার নামে ওই তরুণীরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে তাঁর বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।

মৃত্যুর খবরে হৃদ্‌রোগে ফুফুর মৃত্যু

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ অক্টোবর রাতে মারা যান তাঁর ফুফু আবেদা বেগম। ছোটবেলা থেকেই নজরুলকে আদর-যত্নে বড় করেছিলেন তিনি। প্রিয় ভাতিজার মৃত্যুর খবর মেনে নিতে না পেরে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারটির শোক আরও গভীর হয়েছে।

নজরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আব্দুল বাছির ও রহিমা বেগম দম্পতির সন্তান। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর উপার্জনেই চলত পরিবারের সংসার।

সংসারের অভাব ঘোচাতে সৌদি আরব

পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে সৌদি আরবে যান নজরুল। মক্কা নগরীতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তবে সৌদি আরবে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন।

মসজিদ কম্পাউন্ডে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশটির আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তিন বছরেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন নজরুল।

ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার অভিযোগ সহপাঠীর

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড মেনে নিতে পারছেন না তাঁর সহপাঠী ও এলাকাবাসী। তাঁদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা নিশ্চিত না করেই তড়িঘড়ি করে নজরুল ও সিতি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ ঘটনায় সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

নজরুলের সহপাঠী মো. মাহফুজ বলেন, ‘জেলখানা থেকে আমাকে ফোন করেছিল নজরুল। সে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। ঘটনাস্থলে নজরুল উপস্থিত থাকলেও ঘটনার সঙ্গে সে জড়িত ছিল না। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। তাছাড়া ভাষাগত জটিলতার কারণেও সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেনি।’

নজরুলের প্রতিবেশী ও সৌদি প্রবাসী মো. আনোয়ারও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি বলেই সৌদি সরকার এ কাজটা করতে পেরেছে। যদি আমেরিকা বা ভারতীয় অথবা অন্য কোনো শক্তিশালী দেশের নাগরিক হতো, তাহলে হয়তো মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে বহুবার চিন্তা করতো।’

এলাকাবাসীর এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে সৌদি কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি।

ছেলের মরদেহ দেশে ফেরত চান মা

ছেলের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলার স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারিনি এই রোববার আমার সন্তানের জীবনে শেষ রোববার হবে। আমরা মনে করেছি যেহেতু তিন বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে, হয়তো পাঁচ বছর হলে আমার ছেলেকে দেশে পাঠিয়ে দেবে।’

ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি শেষবারের মতো আমার ছেলেকে দেখতে চাই, একবার ওর লাশটা ছুঁয়ে দেখতে চাই। সরকারের কাছে আমাদের দাবি যেন আমার ছেলের লাশটা ফিরিয়ে আনে, আমাদের যেন সহযোগিতা করে।’

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, নজরুলের মরদেহ দেশে আনার জন্য এবং তাঁর পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে জেলা প্রশাসন।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে নজরুলের স্বজনদের। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো দেখতে চান মা রহিমা বেগম। পাশাপাশি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁর বাবা-মা।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)

/এএসএফ