দুর্গাপূজায় ১৯ জনের মৃত্যু, বইয়ের স্টল ভাঙতে পুলিশের ব্যস্ততা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিতর্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজার মণ্ডপে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার। একই সময়ে কলকাতার যাদবপুরে বামপন্থী সংগঠনগুলোর বইয়ের স্টল সরিয়ে দিতে পুলিশ ও কলকাতা পৌরসংস্থার কর্মকর্তাদের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংবাদমাধ্যমটি।
১৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় যাদবপুরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআই(এম)-এর একটি বইয়ের স্টলে গিয়ে সেটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় পুলিশ ও কলকাতা পৌরসংস্থার কর্মকর্তারা। স্টলের উদ্যোক্তারা পৌরসভার অনুমতিপত্র দেখালেও তাঁদের নির্দেশ পরিবর্তন হয়নি বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে। অথচ কাছাকাছি এলাকায় মার্ক্স ও লেনিনকে বয়কটের আহ্বান জানিয়ে স্থাপন করা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) একটি স্টল অক্ষত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসবে পদদলনের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর খবর সামনে আসে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি ছিল। উদ্ধারকাজে প্রথমে স্থানীয় কয়েকজন তরুণ এগিয়ে আসেন। অন্যদিকে, দায়িত্বে থাকা গেরুয়া পোশাক পরা স্বেচ্ছাসেবকদের কয়েকজন মানুষকে উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে কলেজছাত্রী ও স্কুলশিক্ষার্থী
নিবন্ধে দুর্ঘটনায় নিহত কয়েকজনের পরিচয় ও তাঁদের পরিবারের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
নিহতদের একজন নিউ ব্যারাকপুরের ১৯ বছর বয়সী কলেজছাত্রী। তাঁর বাবা পেশায় দর্জি। বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় দুর্গাপূজা দেখতে এসেছিলেন তিনি।
আগরপাড়ার ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরও প্রাণ হারিয়েছে। জনস্রোতের চাপে সে মা-বাবার হাত থেকে ছিটকে পড়ে যায়। পরে তার চাচা বহু মরদেহের মধ্যে তাকে খুঁজে পান বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নিউ টাউনের একাদশ শ্রেণির দুই ছাত্রীও মারা গেছে। বিকেলে আরেক বন্ধুর সঙ্গে পূজামণ্ডপ দেখতে বেরিয়েছিল তারা। তিনজনের মধ্যে একজন বাড়ি ফিরলেও বাকি দুজনের মা-বাবাকে ভিডিও কলে তাঁদের সন্তানের মরদেহ শনাক্ত করতে হয় বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
এসব ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিবন্ধের লেখক নিহতদের পরিবারের শোক এবং দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বিজেপি সরকারের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন
নিবন্ধে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের দাবি, ২০২৬ সালের মে মাসের নির্বাচনে বিজেপি ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৮টি পেয়ে ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনী প্রচারে দলটি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় উৎসব সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখক আরও দাবি করেছেন, রাজ্যে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রচারের সময় বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা ৭০ শতাংশের বেশি ছিল বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, উৎসবকেন্দ্রিক সহিংসতা বোঝাতে বিজেপির রাজ্য শাখার প্রচার করা একটি ছবির কোলাজকে অল্ট নিউজের অনুসন্ধানে অন্য ঘটনার ছবি বলে শনাক্ত করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ছিল নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোর একটি। কিন্তু চোরবাগানের দুর্ঘটনা সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে লেখকের অভিমত।
পূজামণ্ডপের আশপাশে জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর কলকাতা পুলিশ চোরবাগান ও সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউসহ উত্তর কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারার অধীনে তিন দিনের জন্য পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
লেখকের মতে, একসময় কলকাতা পুলিশের পূজা ব্যবস্থাপনা প্রশংসিত হতো। কিন্তু এ বছর ঘন ঘন বদলি ও ভিআইপি ডিউটির কারণে বাহিনীর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর দাবি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যের পরিবর্তে গেরুয়া পোশাক পরা স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর নির্ভর করা হয়েছিল।
নিবন্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের মনোযোগ আহতদের উদ্ধার ও স্বজনদের সহায়তার পরিবর্তে ঘটনার দায় এবং সংবাদ কীভাবে সামাল দেওয়া যায়, সেদিকে বেশি ছিল।
অমিত শাহের সফর নিয়েও সমালোচনা
নিবন্ধে বলা হয়েছে, চোরবাগানে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় পৌঁছান। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বৃষ্টির মধ্যে শিল্পীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটিকে তিনি প্রশাসনের সংবেদনশীলতার অভাবের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এ ছাড়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে নিবন্ধে সমালোচনা করা হয়েছে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী ১৩টি পরিবারের তাঁর ওপর আস্থা রাখাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে উল্লেখ করেছিলেন। ১৯ জনের প্রাণহানির পর এ ধরনের বক্তব্যের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন লেখক।
যাদবপুরে বইয়ের স্টল সরাতে পুলিশের অভিযান
নিবন্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে যাদবপুরে বামপন্থী সংগঠনগুলোর বইয়ের স্টল উচ্ছেদের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের দাবি, শনিবার রাতজুড়ে পুলিশ একাধিকবার স্টলগুলোতে অভিযান চালায় এবং শেষ পর্যন্ত সিপিআই(এম), অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা) ও অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটসের (এপিডিআর) স্টল সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
নিবন্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, স্টল ভাঙার জন্য বুলডোজার আনা হয়েছিল এবং বই সরিয়ে নিতে কলকাতা পৌরসংস্থার ময়লার গাড়ি ব্যবহার করা হয়। কিছু জায়গায় বই রাস্তায় ছুড়ে ফেলা ও লাথি মারার অভিযোগও করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি দাবি করেছেন, দলটি এ ঘটনায় জড়িত নয় বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
নিবন্ধের শেষাংশে লেখক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ১৯ জনের পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। মুখ্যমন্ত্রী তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন উল্লেখ করে লেখক সাধারণ মানুষকে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে দুর্গাপূজার মণ্ডপে প্রাণহানি এবং যাদবপুরে বইয়ের স্টল উচ্ছেদের ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক অগ্রাধিকার, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে সমালোচনা করেছেন তিনি।
/এএসএফ