• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম


যে আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৬:৩৬ পিএম

চলতি বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে সুইডেনের স্টকহোম থেকে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স।

দক্ষিণ মেরুর শত শত মিটার গভীর বরফের নিচে বিশাল এক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা তৈরি করে দূরবর্তী মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন ফ্রান্সিস হালজেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স।

নিউট্রিনোকে মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ও অধরা কণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই এবং এর ভরও প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। অন্য কোনো পদার্থের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া এতটাই দুর্বল যে সাধারণভাবে এটি প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই মিথস্ক্রিয়া করে না বললেই চলে।

প্রতি সেকেন্ডে মানুষের আঙুলের ডগার ওপর দিয়ে সূর্য থেকে আসা প্রায় ৬৫ বিলিয়ন নিউট্রিনো প্রবাহিত হলেও এর উপস্থিতি বোঝার কোনো উপায় নেই। কিন্তু কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি কিংবা নক্ষত্রের বিস্ফোরণ থেকে হাজার কোটি মাইল পথ পাড়ি দিয়ে যখন এই অধরা কণা পৃথিবীতে পৌঁছায়, তখন সেটি মহাবিশ্বের গভীর রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করতে পারে। ফ্রান্সিস হালজেনের গবেষণা সেই নিউট্রিনো শনাক্ত করে তার বহন করা তথ্য বিশ্লেষণের নতুন পথ তৈরি করেছে।

নিউট্রিনো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বেলজিয়ামে বেড়ে ওঠার সময়ই কণা পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফ্রান্সিস হালজেন। পিএইচডি শেষ করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে যোগ দেন।

মহাজাগতিক রশ্মির অত্যন্ত উচ্চশক্তির প্রোটন কণাগুলো কীভাবে তৈরি হয় এবং সেগুলো কোথা থেকে আসে—এ প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্য হয়ে ছিল। মহাশূন্যের শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্র প্রোটনের গতিপথ বাঁকিয়ে দেয়। ফলে কোনো প্রোটন ঠিক কোন উৎস থেকে এসেছে, তার গতিপথ অনুসরণ করে সরাসরি তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না।

তবে মহাজাগতিক কণা ত্বরকগুলোতে প্রোটন ত্বরান্বিত হওয়ার সময় নিউট্রিনো ও গামা রশ্মি তৈরি হয়। গামা রশ্মি মহাজাগতিক ধূলিকণায় আটকে যেতে পারে অথবা পথ চলতে গিয়ে শক্তি হারাতে পারে। কিন্তু নিউট্রিনোর গতিপথে বাধা দেওয়ার মতো শক্তি মহাবিশ্বের কোনো কিছুরই নেই।

এই কারণে উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর গতিপথ শনাক্ত করা সম্ভব হলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে চরম ও সহিংস ঘটনাগুলোর উৎসে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। এর মধ্যে সক্রিয় গ্যালাক্সি কিংবা বিস্ফোরিত নক্ষত্রের মতো ঘটনাও রয়েছে।

দক্ষিণ মেরুর বরফে নিউট্রিনো শনাক্তের উদ্যোগ

আশির দশকে হালজেন উপলব্ধি করেন, মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্ত করার জন্য দক্ষিণ মেরুর অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তর অত্যন্ত উপযোগী হতে পারে। সমুদ্রের পানির তুলনায় গভীর বরফ অনেক বেশি স্বচ্ছ ও স্থির হওয়ায় সেখানে নিউট্রিনোর ক্ষীণ সংকেত শনাক্ত করার সম্ভাবনা ছিল।

তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। প্রচণ্ড শীতের অ্যান্টার্কটিকায় মাইলের পর মাইল বরফ গলিয়ে গভীর গর্ত তৈরি করতে হতো। এরপর সেই গর্তের ভেতরে সংবেদনশীল আলোক শনাক্তকারী সেন্সর স্থাপন করতে হতো। উষ্ণ পানি ব্যবহার করে বরফ গলিয়ে গর্ত তৈরি করা হয় এবং বিশেষ কেবল ও অপটিক্যাল মডিউল বা আলোক সেন্সর বরফের গভীরে নামিয়ে দেওয়া হয়।

কোনো মহাজাগতিক নিউট্রিনো অত্যন্ত বিরলভাবে বরফের কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে সেখানে চার্জযুক্ত কণা তৈরি হয়। এর ফলে বরফের ভেতরে নীল আলোর ক্ষীণ ঝলকানি দেখা যায়। বরফের ভেতর ছড়িয়ে পড়া ওই আলোর দিক বিশ্লেষণ করে সেন্সরগুলো নিউট্রিনোর গতিপথ ও শক্তি পরিমাপ করতে পারে।

অ্যামান্ডা থেকে আইসকিউব

প্রথমদিকে অ্যামান্ডা প্রকল্পের মাধ্যমে এই পদ্ধতির পরীক্ষা শুরু হয়। তবে প্রত্যাশিত সাফল্য আসে আরও বড় পরিসরে কাজ শুরু করার পর। গড়ে ওঠে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।

বরফের গভীরে প্রায় এক ঘনকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ২ হাজার ৪৫০ মিটার গভীরতায় ৮৬টি কেবলে মোট ৫ হাজার ১৬০টি আলোক সেন্সর স্থাপন করা হয়।

২০১১ সালে আইসকিউব সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয়। এরপর ২০১৩ সালের মধ্যে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে তারা সৌরজগতের বাইরে গভীর মহাবিশ্ব থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।

আইসকিউবের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে এবং দূরের সক্রিয় গ্যালাক্সি, যেমন এনজিসি ১০৬৮ থেকে আসা নিউট্রিনোর সন্ধান পেয়েছেন। প্রচলিত আলো কিংবা টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাবিশ্বের যেসব অন্ধকার ও ধূলিময় অঞ্চল দেখা সম্ভব ছিল না, নিউট্রিনো এখন সেসব অঞ্চল থেকে নতুন তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে।

ফ্রান্সিস হালজেনের প্রবর্তিত এই পদ্ধতি অনুসরণ করে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা চলছে। বৈকাল হ্রদ, ভূমধ্যসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের পানির নিচেও নতুন নিউট্রিনো টেলিস্কোপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ মেরুতে আইসকিউবকে আরও বড় করে দ্বিতীয় প্রজন্মের আইসকিউব তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এর আয়তন হবে প্রায় ৮ ঘনকিলোমিটার।

মহাবিশ্বে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটে, যেগুলোর আলো হয়তো পৃথিবীতে পৌঁছায় না। কোনো বার্তা মহাজাগতিক ধূলিকণায় আটকে যায়, কোনোটি পথে শক্তি হারায়, আবার কোনোটি মহাকাশের চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে তার উৎসের সঠিক ঠিকানা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু নিউট্রিনো এসব বাধাকে প্রায় উপেক্ষা করেই ছুটে আসে। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো ভয়ংকর মহাজাগতিক ঘটনার তথ্যও এই কণার মাধ্যমে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে।

পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর গভীর বরফে কোনো এক মুহূর্তে যখন একটি নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন তৈরি হয় ক্ষীণ নীল আলোর ঝলক। বরফের অন্ধকারের সেই ক্ষুদ্র আলোক সংকেত আইসকিউবের কোনো একটি সেন্সর শনাক্ত করে। আর সেই এক ঝলক আলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে মহাবিশ্বের বহু বিলিয়ন বছরের পুরোনো কোনো রহস্যের উত্তর।

২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার সেই ক্ষীণ আলোর ঝলক শনাক্ত করার বৈজ্ঞানিক সাফল্যকেই স্বীকৃতি দিল। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিল, মহাবিশ্বের রহস্য জানতে সব সময় আকাশের দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো সেই রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে মানুষের পায়ের নিচে, কয়েক কিলোমিটার বরফের অন্ধকারে।

আগামী ৭ অক্টোবর (বুধবার) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের নাম ঘোষণা করা হবে। এরই মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিন বিজ্ঞানী এ বছরের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

নোবেলজয়ীরা প্রত্যেকে একটি নোবেল মেডেল, একটি সনদপত্র এবং মোট ১২ মিলিয়ন বা ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা অর্থমূল্য পাবেন। ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। ২০২৬ সালে তা বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ লাখ ক্রোনা বা প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

নোবেল ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হানা স্টিয়ারনে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে নোবেল পুরস্কারের ১২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে অর্থমূল্য বাড়ানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ধরে রাখার চেষ্টা হিসেবে এই অর্থ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ মিলিয়ন ক্রোনা থেকে বাড়িয়ে ১১ মিলিয়ন করা হয়েছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এতে আর কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ২০২৬ সালে আবারও ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা বাড়ানো হলো।

যেসব বিভাগে একাধিক নোবেলজয়ী থাকবেন, সেখানে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা তাদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। বর্তমান বাজারদরে এই অর্থের মূল্য প্রায় ১২ লাখ ৮ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার বেশি।

/এসএন