সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে নতুন করে কৌশলগত হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা একসঙ্গে কাজে লাগার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে।
এই চুক্তি ঘিরে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে। রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কি সংকটে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা এনে দেবে? তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি কি পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত হবে? আর এই চুক্তির মাধ্যমে কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো শক্তিশালী জোটের উত্থান ঘটছে?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে দুইভাবে দেখা যায়। চুক্তির সমালোচকদের মতে, এর বাস্তব সামরিক গুরুত্ব খুব বেশি নয়। কারণ সাধারণত সামরিক জোট গড়ে ওঠে অভিন্ন শত্রুকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এই চুক্তিতে তেমন কোনো অভিন্ন শত্রুর বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি বলেন, ‘পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের শত্রু এক নয়। এটি সামরিক জোটের চেয়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিই বেশি। এর ফলে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন বাড়তে পারে। তবে কেউ কেউ যে এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলছেন, এটি তা হবে না।’
হাক্কানির মতে, চুক্তিটি ‘বাস্তবের চেয়ে প্রতীকী বেশি’। তবে চুক্তিটিকে দেখার আরেকটি দিকও আছে। তিন দেশের কী নেই, সেটির দিকে না তাকিয়ে তারা একে অপরকে কী দিতে পারে, সেটি দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
সৌদি আরব এই জোটে নিয়ে আসছে বিপুল আর্থিক সক্ষমতা। দেশটির বিশাল তেলসম্পদ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মিত্রদের সহায়তা করার মতো অর্থ জোগানের সুযোগ দেয়।
তুরস্কের অবদানও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশটি নিয়ে আসছে সামরিক দক্ষতা এবং ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা প্রতিরক্ষা শিল্প। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক বহু বছর ধরে নিজেদের অস্ত্রশিল্প গড়ে তুলেছে। এখন দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্ত্র রপ্তানি করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে এসব ড্রোন ভূমিকা রাখে এবং আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে।
অন্যদিকে পাকিস্তান এমন একটি সক্ষমতা নিয়ে এসেছে, যা অন্য দুই দেশের নেই। আর তা হলো বিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পারমাণবিক অস্ত্র।
এই পারমাণবিক সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত জোটে পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরব দিচ্ছে অর্থ, তুরস্ক দিচ্ছে প্রযুক্তি আর পাকিস্তান দিচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক্ষমতা। এই পারমাণবিক ছাতাই জোটটিকে এমন কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে, যা রিয়াদ বা আঙ্কারা একা অর্জন করতে পারত না।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি সদস্য দেশে হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে দেশ তিনটির কৌশলগত স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় বাস্তবে এই প্রতিশ্রুতি হুবহু পালন করা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্য কোনো সদস্য দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিপুল ঝুঁকি বিবেচনা করেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য, রসদ বা অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
### ভারতের জন্য কেন উদ্বেগ
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্কের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় তুরস্কের সামরিক সদস্যরা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। একই সময়ে আঙ্কারা পাকিস্তানকে বায়রাকতার টিবি২সহ শত শত ড্রোন সরবরাহ করেছে বলেও খবর রয়েছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রামান মনে করেন, এই জোটে তুরস্কের ভূমিকার সামরিক প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স ফেলোশিপের প্রধান রামান বলেন, ‘সামরিক দিক থেকে ভারতের জন্য ঝুঁকি হলো, তুরস্ক ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও উন্নত ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকেও তারা অনেক বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।’
তার মতে, ‘যুদ্ধে পরীক্ষিত অস্ত্রব্যবস্থা ও দক্ষতা ক্রমেই পাকিস্তানে আসতে দেখা যাবে। আগামী এক বছরে পাকিস্তানের সামরিক আধুনিকায়নে তুরস্ক কীভাবে আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে, সেটি নজরে রাখতে হবে।’
তুরস্ক ভারতের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করলে সৌদি আরবের বিষয়টি আরও ভিন্ন ও জটিল। আঙ্কারার বিপরীতে রিয়াদের ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের সঙ্গেই গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে।
সৌদি আরব ভারতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। জ্বালানি থেকে প্রযুক্তি—বিভিন্ন খ