• ঢাকা
  • সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম


ব্রিকসে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ মোদির, মোদির সঙ্গে তারেকের বৈঠকের সম্ভাবনা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৯ জুলাই ২০২৬ ১২:০৩ পিএম

বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে ভারতের এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বাংলাদেশ সম্মেলনে যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র গত সোমবার প্রথম আলোকে জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন ও মালদ্বীপ সফর শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় ফিরেছেন।

এর আগে ২৩ জুলাই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নামে পাঠানো আমন্ত্রণপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছে। সেটি ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত ১৪ জুলাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়। এতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

ব্রিকস উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি জোট। আর বিমসটেক হলো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সহযোগিতা জোট।

ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে সাধারণত সদস্য নয় এমন নির্বাচিত দেশ ও আঞ্চলিক সংস্থার নেতাদের অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য ১১টি দেশ—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়ার বিষয়টি শুধু একটি বহুপক্ষীয় বৈঠকে উপস্থিত থাকার প্রশ্ন নয়। কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে এবং এ বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর সমর্থনও চেয়েছে। চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের সদস্যপদের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি বর্তমান ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ২০২৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ পেয়ে আসছে। ওই বছর দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে এবং ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত ব্রিকস আউটরিচে বাংলাদেশ অংশ নেয়। তবে ২০২৫ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি।

দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকসের অধিকাংশ সদস্য দেশের শীর্ষ নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বহুপক্ষীয় এই ফোরামের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহী। সে বিবেচনায় আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এটি নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সম্ভাব্য প্রথম বৈঠকের সুযোগও তৈরি করতে পারে।’

তাঁর মতে, বহুপক্ষীয় এই ফোরামের সুযোগ বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত।

বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে মোদির আমন্ত্রণ

ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আমন্ত্রণপত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উল্লেখ করেছেন, ব্রিকস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এবারের শীর্ষ সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এ সম্মেলনে জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং ‘মানবতাই সবার আগে’ নীতির আলোকে সহযোগিতা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক বিষয়েও মতবিনিময়ের সুযোগ থাকবে।

বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ ব্রিকসের আউটরিচ পর্বের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের আগ্রহও ব্যক্ত করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।

গতকাল সচিবালয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশ অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাই সরকারের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে প্রধানমন্ত্রী সেখানে যাবেন কি না। গেলে অনেকের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ থাকবে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা শুরু হয়েছে কি না, সেটিও তাঁর জানা নেই।

সম্পর্কের অস্বস্তি, তবু আলোচনার সুযোগ

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে গতিতে এগোনোর প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে আগ্রহী বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান একাধিক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে জনপরিসরে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তাতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ককে বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষ জনগণকেন্দ্রিক বলে মনে করেনি। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক অগ্রগতির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তারও তেমন প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সীমান্তে ভারতের পুশ-ইনের অব্যাহত চেষ্টা, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের বিভিন্ন মন্তব্য এবং সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার ইচ্ছা প্রকাশ—সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যে ধারায় এগিয়েছে, নির্বাচনের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের প্রশ্নে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও সরকারের বিবেচনায় থাকতে পারে।

একই সঙ্গে নয়াদিল্লিতে শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠকের সুযোগ তৈরি হলে দেশের রাজনৈতিক ও জনমতের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, সেটিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে গতিতে এগোনোর প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতও সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে আগ্রহী।’