• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম


ভারতের জেন-জি আন্দোলন কি সরকারবিরোধী বড় আন্দোলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২২ জুলাই ২০২৬ ৪:০০ পিএম

গত চার বছরে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ঢাকা এবং ২০২৫ সালে নেপালের কাঠমান্ডুর পর এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ভারতের রাজধানী দিল্লি। একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন গত এক সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষকে রাজপথে নামিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের আন্দোলনকে কেবল তরুণদের ক্ষোভ হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় সরকার পতনের ঘটনাগুলোর পেছনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি কাজ করেছে, যার মধ্যে ভারতের বর্তমান বাস্তবতায় তিনটি ইতোমধ্যেই বিদ্যমান বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বাড়ছে ব্যবধান

প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের সমস্যা। ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েট হলেও তাদের মধ্যে মাত্র ২৮ লাখ কাজের সুযোগ পান। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকারদের মধ্যে গ্র্যাজুয়েটদের হার ২০১৭ সালের ৪৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

এদিকে, গত মে মাসে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছে ককরোচ জনতা পার্টি। ওই ঘটনার ফলে ২২ লাখ ৭০ হাজার পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে ভারতের ১৬টি রাজ্যে ৪৮টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার প্রভাব পড়েছে প্রায় দেড় কোটি চাকরিপ্রার্থীর ওপর। ২০২৪ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আইন পাস হলেও ২০২৬ সালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এসব পরীক্ষাই কর্মজীবনে প্রবেশের একমাত্র সুযোগ হলেও প্রশ্নপত্র আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ বারবার উঠছে।

বৈষম্য আরও দৃশ্যমান

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। একজন তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ হওয়ার খবর দেখেন, তখন একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো রাজনীতিকের সন্তানের বিদেশ ভ্রমণ কিংবা কোনো শিল্পপতির সন্তানের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খবরও দেখতে পান।

নেপালের আন্দোলনকারীরা এমন সুবিধাপ্রাপ্তদের ‘নেপো কিডস’ বা স্বজনপ্রীতির সন্তান বলে অভিহিত করতেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি শুধু একটি বিদ্রূপাত্মক শব্দ নয়, বরং বৈষম্যের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার অভিযোগ

তৃতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টি। অভিযোগ করা হয়েছে, যখন অভিযোগের প্রতিকার পাওয়া যায় না, আদালতের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হয়, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভোটারদের উপেক্ষা করেন এবং নির্বাচনেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না, তখন মানুষ রাজপথকেই একমাত্র বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ককরোচ জনতা পার্টির অ্যাকাউন্ট পাঁচ দিনের মধ্যে ব্লক করা হয়। দিল্লিতে তাদের অবস্থান কর্মসূচি অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং সোমবার সংসদমুখী পদযাত্রার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। এরপর নির্দেশ অমান্য করে পদযাত্রা শুরু হলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয় এবং পুলিশের লাঠিচার্জে বহু আন্দোলনকারী আহত হন।

আন্দোলন কীভাবে বিস্তৃত হতে পারে

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন, যখন রাষ্ট্র নিজের ব্যর্থতার পর মানুষের প্রতি অপমানজনক আচরণ করে। উদাহরণ হিসেবে নেপালে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পাঁচ দিনের মধ্যে সরকার পতনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল চাকরির কোটা নিয়ে আদালতের একটি রায় এবং অপমানজনক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। ভারতের বর্তমান আন্দোলনও একটি নির্দিষ্ট অপমানজনক শব্দকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দেশে শুরুতে ছোট ছোট দাবির মাধ্যমে আন্দোলন শুরু হলেও পরে সরকার সেসব দাবিতে সমাধানের পথ না নিয়ে রাজপথ খালি করার কৌশল গ্রহণ করেছিল। এর ফলে আন্দোলনের দাবি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের দাবিতে রূপ নেয়।

প্রতিবেদনের শেষাংশে উল্লেখ করা হয়েছে, সোমবার দিল্লির আন্দোলনও আর শুধু কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

/এসএন