• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম


শিক্ষা থেকে বেকারত্ব—যুব আন্দোলনে বাড়ছে চাপ, বিপাকে মোদি সরকার?

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২২ জুলাই ২০২৬ ১২:৫০ এএম

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সোমবার দিনভর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মেট্রো স্টেশন ও সড়কের বিভিন্ন অংশ বন্ধ করে দেওয়া হলেও বিক্ষোভকারীরা নানা বাধা অতিক্রম করে যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।

পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেও তাদের সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রবল পুলিশি বাধার মধ্যেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে অবস্থান করেন আন্দোলনকারীরা।

গত প্রায় এক মাস ধরে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর নেতৃত্বে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে।

তবে আন্দোলন ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অল্প সময়ে ব্যাপক অনুসারী পাওয়া এই সংগঠন বাস্তবের আন্দোলনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারছে।

যদিও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে দল বলা হচ্ছে, বাস্তবে এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়; বরং একটি নাগরিক সংগঠন। তবে সোমবারের কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ সংগঠনটির মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা নিয়ে ওঠা নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

কলেজ শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে থাকা তরুণ-তরুণীরা দলে দলে রাস্তায় নেমে এসে সরকারের প্রতি বার্তা দিয়েছেন যে, তাদের দাবিগুলো দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

স্বাধীন সাংবাদিক স্মিতা শর্মা, যিনি গত এক মাস ধরে আন্দোলনটি পর্যবেক্ষণ করছেন, বলেন, এই বিক্ষোভ শুধু শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্বসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুও উঠে এসেছে। তার মতে, তরুণরা সরকারের কাছে এসব বিষয়েও জবাবদিহি চাইছে।

সংসদ অভিযানের ডাক

সোমবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিলের ডাক দেয় সিজেপি। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী দিল্লির রাস্তায় নামেন।

বিক্ষোভ শুরুর পর সিজেপি দাবি করে, সরকার তাদের আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা বলেন, আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরাই।

ইনস্টাগ্রামে বৈঠকের একটি ছবি প্রকাশ করে জেপি নাড্ডা জানান, সকালে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন এবং সকাল ১১টা ৫০ মিনিট থেকে আলোচনা শুরু হয়। প্রথমে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিস্তারিত মৌখিক আলোচনা হয়, পরে বিকেল ৪টার দিকে তারা একটি লিখিত স্মারকলিপি জমা দেন।

তিনি আরও জানান, আন্দোলনকারীদের অবস্থান কর্মসূচি শেষ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে এত বড় বিক্ষোভের পরও কেন্দ্রীয় সরকার এখন পর্যন্ত সিজেপির মূল দাবি মেনে নেয়নি। অন্যদিকে সংগঠনটির পক্ষ থেকেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

‘শুধু নিজেদের জন্য নয়’

আন্দোলনের সমর্থক সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেন, যন্তর মন্তরে নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি তার বিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে। তার মতে, এই তরুণরা শুধু নিজেদের স্বার্থের জন্য নয়, একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক রাজনীতির দাবিতে আন্দোলন করছে।

সাংবাদিক স্মিতা শর্মার মতে, সোমবারের বিক্ষোভের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এত বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, যা অনেকের প্রত্যাশারও বাইরে ছিল।

সরকারের জন্য সতর্কবার্তা?

স্মিতা শর্মা আন্দোলনটিকে অনেকাংশে নেতৃত্বহীন গণআন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ ছিল, সিজেপির নেতারা ঠিকভাবে বার্তা পৌঁছে দিতে পারছিলেন না এবং বহু মেট্রো স্টেশনও বন্ধ ছিল। তারপরও বিপুলসংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

তার ভাষ্য, আন্দোলনের সূচনা শিক্ষা ইস্যু নিয়ে হলেও পরে তা মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং ভোট চুরির অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কলেজপড়ুয়াদের মধ্যেও এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ভবিষ্যতে এই আন্দোলন সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে স্মিতা শর্মা বলেন, সরকার যদি এই বিক্ষোভ থেকে শিক্ষা না নেয়, তবে সেটি বড় ভুল হবে। তার মতে, তরুণরা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা সংসদ পর্যন্ত মিছিল করতে প্রস্তুত ছিল। এমনকি সংগঠনটি বাধা দিলেও বহু মানুষ যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত মিছিল করত।

তিনি আরও বলেন, লাঠিচার্জের পরও আন্দোলনকারীরা বারবার ফিরে এসেছে এবং প্রশাসনের মুখোমুখি হয়েছে। মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতেও আরও বড় আকারে বিস্ফোরিত হতে পারে।

প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত অত্রিও মনে করেন, এই যুব আন্দোলন ভবিষ্যতে মোদি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, আন্দোলনের বড় সাফল্য হলো এটি দেখিয়েছে যে দেশের মানুষকে উপেক্ষা করা যাবে না এবং ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তি এখনো শক্তিশালী।

তিনি বলেন, কোনো দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—উভয় ক্ষেত্রেই যুবসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় মানুষ রাস্তায় নামতে দ্বিধা করবে না।

হেমন্ত অত্রির মতে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাইরে জনগণ এখন আবার মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা–সংক্রান্ত মৌলিক ইস্যুগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। যুবসমাজের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বলেও তিনি মন্তব্য করেন।