• ঢাকা
  • সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম


চীনের মেগা বাঁধের নিচে সক্রিয় ফল্ট লাইন, ‘ভূতাত্ত্বিক টাইম বো’মা’ বলছেন গবেষকরা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১১ জুলাই ২০২৬ ৮:৩১ পিএম

চীনের এক ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্র) নদীর ওপর নির্মাণাধীন বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ঠিক নিচে একটি সক্রিয় ভূগর্ভস্থ চ্যুতি বা ফল্ট লাইনের অস্তিত্ব রয়েছে। গবেষকদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের এই সক্রিয় ফল্ট লাইন মেগা বাঁধটির কাঠামোগত নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে’-এর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত মান্দারিন ভাষার গবেষণা সাময়িকী সেডিমেন্টারি জিওলজি অ্যান্ড টেথিয়ান জিওলজি-তে গত মাসে এ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন সেন্টার এবং মিডল ইয়ারলুং সাংপো রিভার ন্যাচারাল রিসোর্সেস অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ স্টেশনের চীনা ভূতাত্ত্বিকদের একটি যৌথ দল।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পাইঝেন ফল্ট’ নামে পরিচিত ভূগর্ভস্থ এই চ্যুতিটি প্লাইস্টোসিন বা বরফ যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই সক্রিয় ফল্ট মেদগ কাউন্টিতে নির্মাণাধীন মেগা বাঁধ, এর সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক, সেতু, টানেল এবং পুরো জলাধার ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে ফল্ট লাইনের আশপাশের শিলাস্তর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। এতে ভূগর্ভস্থ স্তরগুলোর ধারণক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়েছে। ফলে এই ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল বাঁধ এবং এর পেছনে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পানির চাপ বহন করা ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

গবেষকরা আরও সতর্ক করেছেন, তিব্বতের পার্বত্য অঞ্চলের মাটি তুলনামূলকভাবে আলগা এবং এর অভ্যন্তরীণ গঠন দুর্বল। জলাধার পূর্ণ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকা, ফল্ট লাইনের ধারাবাহিক কম্পন এবং সম্ভাব্য ভূমিকম্প একসঙ্গে ঘটলে জলাধারের দুই পাশের পাহাড়ে বড় ধরনের ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাঁধের অবকাঠামো এবং সেখানে কর্মরত ব্যক্তিদের নিরাপত্তাও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

গত বছর তিব্বতে এই মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে এটি চীনের বর্তমান থ্রি গর্জেস বাঁধের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বড় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয়েছে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা।

ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বত থেকে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসাম অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে যমুনা নদী হিসেবে প্রবেশ করেছে। ফলে নদীটির ভাটিতে থাকা ভারত ও বাংলাদেশের জন্যও এই মেগা বাঁধকে একটি সম্ভাব্য ‘ভূতাত্ত্বিক টাইম বোমা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।

চীনা বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্পটি এমন একটি এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে, যা হিমালয় সিসমিক বেল্ট বা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এ এলাকায় চীন এবং আশপাশের অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ঘন ঘন ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এখানে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী ভূমিকম্পীয় বলয় সক্রিয় রয়েছে।

গবেষকেরা কোয়াটারনারি যুগের টেকটোনিক পরিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, পাইঝেন ফল্ট প্লাইস্টোসিন যুগে সৃষ্টি হলেও বর্তমান হলোসিন যুগেও এটি সক্রিয় রয়েছে।

এ ছাড়া প্রাচীন হ্রদের তলানির কার্বন ডেটিং পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৯ হাজার ৫০০ বছর আগেও এই ফল্ট লাইনে সক্রিয়তা ছিল।

গবেষণায় ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিন এলাকায় সংঘটিত ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, ওই ভূমিকম্পটি ফল্ট লাইনের উত্তর প্রান্তে সংঘটিত হয়েছিল এবং এটি বর্তমান ভূকম্পন ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

তাদের ভাষ্য, আঞ্চলিক ভূমিকম্পের প্রভাবে সহজেই বড় ধরনের ভূমিধস ও ভূপৃষ্ঠ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটতে পারে, যা প্রকৌশল স্থাপনা এবং কর্মরত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গবেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে মাঝারি বা বড় মাত্রার কোনো ভূমিকম্প সংঘটিত হলে নির্মাণাধীন বাঁধটি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এর ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম বন্যা ও ভূমিধস হিমালয় অঞ্চল এবং নদীর ভাটির বিস্তীর্ণ জনপদের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

/এসএন