যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ ঘোষণার পর দেশটি গত এক দশকে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার পথে এগোচ্ছে। ব্রেক্সিটের পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে একের পর এক নেতৃত্ব পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে ব্রিটেন। ২০১৬ সালের পর দায়িত্ব নেওয়া কোনো প্রধানমন্ত্রীই পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
### ব্রেক্সিট গণভোট ও ডেভিড ক্যামেরনের বিদায়
২০১৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে রায় দেন ব্রিটিশ ভোটাররা। ফলাফল ঘোষণার পরপরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। যদিও তিনি ব্রেক্সিটের বিরোধিতা করেছিলেন, তবুও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত ছিল তার সরকারের। এরপর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন থেরেসা মে।
ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের জন্য সংসদে শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে ২০১৭ সালে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন থেরেসা মে। কিন্তু সেই নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। পরে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করলেও ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে ব্যর্থ হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন মে।
### বরিস জনসনের উত্থান ও পতন
থেরেসা মের বিদায়ের পর কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বে আসেন বরিস জনসন। ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগানকে সামনে রেখে ২০১৯ সালের নির্বাচনে বড় জয় এনে দেন তিনি। তার নেতৃত্বেই ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে যুক্তরাজ্য।
তবে কোভিড-১৯ মহামারি, বিভিন্ন সরকারি বিতর্ক এবং দলীয় অসন্তোষের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনসনের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। অবশেষে ২০২২ সালে নিজ দলের চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।
### লিজ ট্রাসের সংক্ষিপ্ত মেয়াদ
বরিস জনসনের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন লিজ ট্রাস। কিন্তু তার ঘোষিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আর্থিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে মাত্র ৪৪ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন তিনি। এটি ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী প্রধানমন্ত্রিত্ব হিসেবে রেকর্ড গড়ে।
### ঋষি সুনাকের স্থিতিশীলতার চেষ্টা
২০২২ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং জনসেবার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেন তিনি। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডসংক্রান্ত বিরোধ মেটাতেও অগ্রগতি আনেন।
তবে কনজারভেটিভ পার্টির ক্রমহ্রাসমান জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করতে পারেননি সুনাক। ফলে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হতে থাকে।
### লেবার পার্টির প্রত্যাবর্তন
২০২৪ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে আসে লেবার পার্টি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে কিয়ার স্টারমার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জানান, নতুন সরকার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। একই বছরের অক্টোবরে অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস ব্যাপক কর বৃদ্ধির ঘোষণা দিলে ব্যবসায়ী মহলে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং সরকারের জনপ্রিয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
### স্টারমারের ওপর বাড়তে থাকা চাপ
২০২৫ সালের শুরু থেকে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দ্রুত রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করতে শুরু করে। অভিবাসনবিরোধী অবস্থান এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার মাধ্যমে দলটি জনমত জরিপে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে এবং একপর্যায়ে লেবার পার্টিকেও ছাড়িয়ে যায়।
এরপর ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির হতাশাজনক ফলাফল স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে। সরকারের অভ্যন্তরেও অসন্তোষ বাড়তে থাকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং পদত্যাগ করে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি জানান।
পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে মতবিরোধের জেরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলিও পদত্যাগ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজনীতিতে আবারও নতুন নেতৃত্বের খোঁজ শুরু হয়েছে। গত এক দশকের ধারাবাহিক নেতৃত্ব সংকটের পর এবার নতুন প্রধানমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা ফিরিয়ে আনতে পারবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
/এসএন