মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের কথা থাকলেও প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এখনো প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অনুমোদন পাওয়া নতুন বেতন কাঠামো আবারও কোথাও আটকে গেল কি না।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে গেজেট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে দুই সপ্তাহ পেরিয়ে যাচ্ছে, এখনো গেজেটের কোনো খবর নেই।
এ কারণেই সবার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—আবার কোথায় আটকে গেল!’প্রতি পাঁচ বছর পরপর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার কথা থাকলেও গত ১০ বছরে তা হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ৩১ আগস্ট সরকার নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়। তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হতে পারে।তবে প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও এখনো নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।যদিও প্রজ্ঞাপন জারি নিয়ে এখনই হতাশ হওয়ার কারণ নেই বলে মনে করছেন সাবেক আমলারা। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
এসব প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ, এমনকি অনেক সময় মাসও লেগে যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন পর এবার বেতন কাঠামো ঘোষণা হওয়ায় গেজেট প্রকাশে দেরি নিয়ে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে—এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে দুই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খসড়াটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। এটি বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়েই রয়েছে।আইন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত সপ্তাহে তাঁরা শুনেছিলেন, দুই-এক দিনের মধ্যেই অনুমোদিত বেতন কাঠামোর খসড়া আইনি যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হবে। কিন্তু এখনো সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবশ্য বিষয়টি খসড়া আটকে থাকার মতো কিছু নয় বলে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, গেজেট প্রকাশের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে সময় লাগছে।জানা গেছে, সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে। খসড়াটি দ্রুতই আইনি যাচাইয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।এর আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরপর প্রায় সাড়ে তিন মাস পর ১৫ ডিসেম্বর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে প্রশাসনিক ও আইনগত বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া প্রস্তুত করে।সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো খসড়ায় মূলত কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে, সেই প্রস্তাব থাকে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা যুক্ত করা হয়।এই নির্দেশনায় জনপ্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়।সাবেক এই সচিবের মতে, এসব বিষয়ে আগে থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ সময় লেগে যেতে পারে।প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে সংবিধান ও চাকরি-সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে খসড়াটির কোনো অসঙ্গতি বা বিরোধ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
একই সঙ্গে খসড়ায় ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য এবং আইনি পরিভাষায় কোনো অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়।এ ছাড়া নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা বা সংবিধিবদ্ধ আদেশের খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।চূড়ান্ত খসড়া হাতে পাওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয় সেটি মুদ্রণের জন্য সরকারি মুদ্রণালয়ে পাঠায়। মুদ্রণ শেষ হলে অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করে।ফলে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়ে গেলেও গেজেট প্রকাশের আগে আরও কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। আর এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষাতেই এখন সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সময় গড়াচ্ছে।
/বিএসএস