রাতে নৌঘাটের পাহারাদার, দিনে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষক দ্বীন ইসলামসুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী সাহিদাবাদ গ্রামের দ্বীন ইসলাম। রাতের বেলায় যাদুকাটা নদীর তীরের নৌঘাটে নৌযান পাহারা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। আর দিনের আলো ফুটতেই বসেন শিক্ষকতার কাজে। কোনো বেতন, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা কিংবা উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ ছাড়াই গত তিন বছর ধরে হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিনা মূল্যে পড়িয়ে আসছেন তিনি।বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছেন দ্বীন ইসলাম। নিজের জীবনে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলেও অন্যের সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার মধ্যেই খুঁজে নিয়েছেন জীবনের আনন্দ ও সার্থকতা।যাদুকাটা নদীর তীরে সাহিদাবাদ গ্রামে তাঁর এই পাঠশালার চিত্র অন্য রকম এক শিক্ষার গল্প তুলে ধরে। অস্থায়ী নিবাসের পাশে খোলা আকাশের নিচে চটের বস্তা ও মাদুর বিছিয়ে বসে থাকে একদল শিশু। সুইটি আক্তার, নেহা আক্তার, রেবেকা আক্তার, মনি বেগম, জাহেদুল মিয়া, সুবর্ণা আক্তার ও সুরাইয়া আক্তারসহ অনেক শিশু একসঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি পড়ে। কেউ বইয়ের পাঠ মুখস্থ করে, আবার কেউ মনোযোগ দিয়ে শেখে গণিতের হিসাব।প্রতিদিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে তাদের পাঠদান। সেখানে নেই পাকা ঘর, বেঞ্চ কিংবা চেয়ার-টেবিল। শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয় উপকরণেরও অভাব রয়েছে। নেই চক, ডাস্টার কিংবা ব্ল্যাকবোর্ড। তবু এসব সীমাবদ্ধতা দ্বীন ইসলামের আগ্রহে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। শিশুদের পাশে বসে কিংবা তাদের চারপাশে ঘুরে ঘুরে পাঠ বুঝিয়ে দেন তিনি। ভুল হলে শুধরে দেন, আবারও পড়তে উৎসাহিত করেন।শিক্ষার্থীদের অনেকের গায়ে জীর্ণ পোশাক, বসার জায়গাটিও অপ্রতুল। কিন্তু পড়াশোনা শেখার আগ্রহে তাদের চোখেমুখে দেখা যায় উচ্ছ্বাস। সীমিত সামর্থ্য আর শিক্ষার প্রতি গভীর ভালোবাসাকে পুঁজি করেই এগিয়ে চলছে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।দ্বীন ইসলামের নিজের জীবনও নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। গাজীপুরের কালিয়াকৈর মিশনারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের তামিলনাড়ুতে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে একটি নামকরা কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হবেন।কিন্তু এরই মধ্যে তাঁর বাবা মারা যান। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে উচ্চশিক্ষা শেষ না করেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি। নিজের শিক্ষাজীবনের সেই অপূর্ণতা আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে অন্য শিশুদের যেন একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেই প্রত্যাশা থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে দ্বীন ইসলাম বলেন, “পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নানা কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক হতে না পারলেও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াতে পেরে আত্মতৃপ্তি পাই। আমি চাই, দরিদ্র পরিবারের শিশুরাও লেখাপড়া শিখে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক। রাতে ঘাটে নৌযান পাহারা দিই, আর দিনের বেলায় শিশুদের পড়াই। এভাবেই আমার সময় কাটে।”দ্বীন ইসলামের এই মানবিক উদ্যোগে নীরব সমর্থন রয়েছে তাঁর স্ত্রী রেজিয়া আক্তারেরও। স্বামীর সীমিত সামর্থ্য, কঠোর পরিশ্রম ও শিশুদের প্রতি ভালোবাসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার স্বামী কাজপাগল মানুষ। তাঁর ঘরবাড়ি কিংবা তেমন কোনো সহায়-সম্পদ নেই। রাত জেগে পাহারাদারের কাজ করেন, আবার দিনের বেলায় শিশুদের পড়াতে বসেন। নিজের কষ্টের কথা চিন্তা না করে তিনি শিশুদের জন্য সময় দেন। এমন মানুষ সত্যিই খুব কম দেখা যায়।”সাহিদাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, “দ্বীন ইসলামের কাছে এলাকার শিশুরা বিনা বেতনে পড়াশোনা করে। দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের অনেক সন্তান নিয়মিত তাঁর কাছে আসে। এখানে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ বা প্রয়োজনীয় উপকরণ কিছুই নেই। তারপরও তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে শিশুদের পড়ান। তাঁর এই উদ্যোগ এলাকার অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য অনেক উপকারে আসছে।”গ্রামাঞ্চলের অনেক দরিদ্র পরিবারের শিশু আর্থিক অসচ্ছলতা, শিক্ষার উপকরণের অভাব কিংবা উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় দ্বীন ইসলামের উদ্যোগ শুধু কয়েকটি শিশুকে পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানোরও একটি প্রয়াস।কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় কিংবা আর্থিক প্রাপ্তির প্রত্যাশা ছাড়াই তিনি যে দায়িত্ব পালন করছেন, তা সমাজের জন্য অনুকরণীয়। রাতের অন্ধকারে নৌঘাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন দ্বীন ইসলাম, আর দিনের আলোয় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সামনে খুলে দেন জ্ঞানের নতুন দুয়ার।নিজের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্নকে অন্যদের সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার এই প্রচেষ্টা দেখিয়ে দেয়, শিক্ষক হওয়ার জন্য শুধু পদবি কিংবা শ্রেণিকক্ষই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানুষের জন্য কিছু করার আন্তরিক ইচ্ছা। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সাহিদাবাদের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন দ্বীন ইসলাম। তাঁর এই উদ্যোগ মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
/বিএসএস