কক্সবাজারের পর্যটন জোনের সুগন্ধা পয়েন্টে মধ্যরাতে শত কোটি টাকা মূল্যের সরকারি খাসজমি দখলের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন আগে ইজারা বাতিল হয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসা একটি মূল্যবান প্লট রাতের আঁধারে টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। রোববার সকালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় চাঞ্চল্য ও সমালোচনা তৈরি হয়। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি চক্র এই দখল কার্যক্রম চালিয়েছে—এমন প্রচারণাও ছড়িয়ে পড়ে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) গভীর রাতে কোনো একসময় ওই দখল কার্যক্রম চালানো হয় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। রোববার (১৬ আগস্ট) সকালে বিষয়টি জানাজানি হলে দখল করা প্লটের আশপাশে রাস্তার পাশে বসা বিভিন্ন হকার, তাদের পরিবারের সদস্য এবং উৎসুক মানুষ ভিড় করেন। অনেকে ঘটনাটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এ নিয়ে হকার ও কথিত দখলকারীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘কোনো বক্তব্য নয়- যারাই দখল করুক উচ্ছেদ করা হবে।’
জেলা প্রশাসকের এমন ঘোষণার পর রোববার বিকেলে অভিযান চালানো হয়। জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েমের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বীচকর্মী ও শ্রমিকরা সেখানে গিয়ে দখলের জন্য স্থাপন করা টিন ও বাঁশের বেড়া সরিয়ে দেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকারদের দাবি, ঘেরাও করা জমির পরিমাণ ১০ একরের বেশি। পর্যটন জোনের এই জমির বাজারমূল্য শত কোটি টাকা বলে দাবি তাদের। তবে কারা ওই জমি ঘিরে দখলের চেষ্টা করেছে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘেরাও করা জমিটি একসময় এস আলম গ্রুপের নামে ইজারা দেওয়া একটি প্লট ছিল। ইজারার শর্ত যথাযথভাবে পালন না হওয়ায় পরে সেই ইজারা বাতিল করা হয়। এস আলমের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষমতাসীন দলের কারও ইশারায় স্থানীয় চিহ্নিত কিছু নেতাকর্মী এই দখল কার্যক্রমে যুক্ত—এমন অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যরাতে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক টিন ও বাঁশ নিয়ে হঠাৎ ওই এলাকায় হাজির হন। তাদের সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল সেখানে অবস্থান করছিল। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তড়িঘড়ি করে জমির বড় একটি অংশ টিন ও বাঁশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, ঘেরাওয়ের আগে ওই এলাকায় শতাধিক ভাসমান দোকান ছিল। দোকানগুলো সরিয়ে জমি ঘিরে ফেলার সময় কয়েকজন হকারের সঙ্গে শ্রমিকদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হকাররা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ টিনের বেড়ার একটি অংশ ভাঙচুর করেন। তবে সে সময় কথিত দখলদারদের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী পরিচয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই দখল কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। স্থানীয় যুবদল নেতা আজিজুল হক সোহেল এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তোলেন, সুগন্ধা পয়েন্টের সরকারি জমি আবারও দখলবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে কি না। রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।
সুগন্ধা পয়েন্টের এই জমিকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ভূমি-বিতর্ক রয়েছে। সৈকতসংলগ্ন সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানের প্রায় ১৩০ একর জমিতে ২০০৩ সালে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই জমি ৮৭টি প্লটে ভাগ করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল।
ইজারার শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও অনেক ইজারাদার তা করতে পারেননি। পরে সংসদীয় কমিটি এবং ভূমি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি জেলা প্রশাসন ৫৯টি প্লটের ইজারা বাতিল করে।
ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন ইজারাদারেরা। প্রায় এক দশক ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৯ সালে উচ্চ আদালতের রায়ে সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। তথ্য অনুযায়ী, ৫৭টি প্লটের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে রায় বহাল থাকায় জেলা প্রশাসন পর্যায়ক্রমে এসব জমির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালেই বাতিল হওয়া প্লটগুলোর বাজারমূল্য ছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে এসব জমির বাজারমূল্য আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এ বিষয়ে নতুন করে কোনো সরকারি মূল্যায়ন করা হয়নি।
সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার পরও বাতিল হওয়া প্লটগুলোর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একটি বাতিল প্লটে সি-ইন মার্কেটের মতো বাণিজ্যিক স্থাপনা রয়েছে, যেখানে শতাধিক দোকান চালু আছে। এর পাশেই রয়েছে ড্রাগন মার্কেট। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে দোকান, রেস্তোরাঁ, পরিবহন কাউন্টার ও আবাসিক কক্ষ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ফলে আদালতের রায়ে সরকারের মালিকানায় ফিরে আসা এসব জমি বাস্তবে পুরোপুরি জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন আন্দোলনের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ রুবেল বলেন, পর্যটন জোনের সরকারি জমি দখলের অভিযোগ নতুন নয়। এর আগেও রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রায় ২ দশমিক ৩০ একর সরকারি জমি দখলের চেষ্টা হয়েছিল। পরে প্রশাসনের যৌথ অভিযানে ওই জমি দখলমুক্ত করে সেখানে সরকারি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।
তিনি জানান, সুগন্ধার আরেকটি অংশে প্রায় ৫০ শতক সরকারি জমি দখলের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট যৌথ অভিযান চালিয়ে ঘেরাও অপসারণ করা হয়েছিল। তবে পরে ওই জায়গাতেও পুনরায় দখলের অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় সরকারি জমি দখলের চেষ্টা হলেও শুরুতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে পরে প্রশাসন মাঠে নামে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে দলের একটি অংশ এখানকার মূল্যবান জমি দখল করে ঝুপড়ি দোকান বা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং ইজারার শর্ত পূরণ না করায় যেসব প্লটের ইজারা বাতিল করা হয়েছিল, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরও ইজারাদারেরা সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে পারেননি। ফলে বাতিল হওয়া এসব জমির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু টিনের বেড়া সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। পর্যটন জোনে সরকারি জমির দখল, ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন। নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা না হলে মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি আবারও প্রভাবশালী দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
জেলা প্রশাসন রোববার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করে।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহামদুর রহমান সায়েম বলেন, দখলের চেষ্টায় জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। উচ্ছেদ শেষে বাতিল প্লটগুলোতে পুনরায় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে।
তিনি বলেন, জমির মালিকানা বা ইজারার পক্ষে কারও কাছে বৈধ নথি থাকলে তা জেলা প্রশাসক অথবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে উপস্থাপন করতে হবে। প্রশাসন জমি বুঝিয়ে দেবে। তবে সরকারি কোনো জমি জবরদখল করতে দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, হকাররা জানান, হকারি করেই তাদের সংসার চলে। তাদের দোকান ও ভ্যান সরিয়ে দেওয়া হলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। সরকারি এই জমিতে ভাসমান দোকান বসানোর অনুমতি দেওয়া হলে সেখান থেকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় হতে পারে বলেও দাবি করেন তারা।
/এসএন