• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫২ এএম


মাদ্রাসার শিক্ষক থেকে মানবপা/চার চ/ক্রের ‘ড ন’, লিবিয়ায় জি/ম্মি অন্তত ৬৫ যুবক

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৩ আগস্ট ২০২৬ ৯:১২ পিএম

মাত্র ২৫ হাজার টাকা বেতনে মাদ্রাসার শিক্ষকতা করতেন। তবে সেই পেশা ছেড়ে মানবপাচার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে অল্প সময়েই বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে মাদারীপুরের খন্দকার হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। মানবপাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য ও ‘মাফিয়া ডন’ হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অন্তত ৬৫ যুবককে লিবিয়ার বন্দিশালায় আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের কারণে তার চারটি ব্যাংক হিসাবও ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ গোপালপুর এলাকার খন্দকার আলমগীর হোসেনের ছেলে খন্দকার হাবিবুর রহমান ডাসার উপজেলার ধজি হামিদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাসিক ২৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে প্রায় দুই বছর আগে মানবপাচার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ব্যবসায় বড় অঙ্কের অর্থ আসতে শুরু করলে প্রায় ছয় মাস আগে তিনি স্বেচ্ছায় শিক্ষকতার চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকার যুবকদের ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাদের লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে মাফিয়া চক্রের হাতে আটকে রাখা হয়। পরে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ হিসেবে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়। অনেক পরিবার ভিটেমাটি বিক্রি কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে টাকা পরিশোধ করলেও গত ১০ মাসেও অন্তত ৬৫ যুবকের মুক্তি মেলেনি। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ স্বজনরা অভিযুক্ত হাবিবুর রহমানের বাড়ি ঘেরাও করে বিচার দাবি করেছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রত্যেকের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে সরাসরি ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অগ্রিম অর্থ নেওয়ার পরও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত দুই বছরে হাবিবুর রহমানের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়টি নজরে আসার পর গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের চারটি হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক ফ্রিজ করে দেয়। এরপর থেকে এসব হিসাবে লেনদেন বন্ধ রয়েছে।

এদিকে মানবপাচারের আশঙ্কা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর লেনদেনের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করে বিভিন্ন ব্যাংকে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ডাসার উপজেলার বনগ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিম ঘরামীর ছেলে হাবিবুল ঘরামীকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে এককালীন ২০ লাখ টাকা নেন হাবিবুর রহমান। পরে তাকে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে মাফিয়া চক্রের হাতে বন্দি করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আরও ৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়।

একইভাবে রামনগর গ্রামের নুরু সরদারের ছেলে সিফাত সরদারের কাছ থেকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ২২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি গত ১০ মাস ধরে লিবিয়ায় বন্দি রয়েছেন। একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর গ্রামের হাবিব হাওলাদারের ছেলে সাগর এবং মাদারীপুরের পশ্চিম শিকারমঙ্গল গ্রামের আক্তার বেপারীর ছেলে ফয়সাল হোসেনসহ অন্তত ৬৫ জন যুবক। তারা সবাই সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বর্তমানে লিবিয়ার বন্দিশালায় আটক রয়েছেন।

ভুক্তভোগী হাবিবুলের নানী রোকেয়া বেগম বলেন, ‘অনেকবার হাবিবের বাড়িতে এসেছি। কিন্তু কোনো সঠিক উত্তর পাচ্ছি না। তিনি বাড়িতেও নেই। আমি এখন নিরুপায় হয়ে গেছি। এই ঘটনায় হাবিবের কঠিন বিচার চাই।’

সিফাতের বড় ভাই রিফাত সরদার বলেন, ‘মূলহোতা হাবিব মাস্টার। তিনি প্রলোভন দেখিয়ে আমার ভাইকে বন্দি করে রেখেছেন। এখন ভাইকে মুক্ত করছেন না, ইতালিও পাঠাচ্ছেন না। এমনকি আমাদের টাকা ফেরতও দিচ্ছেন না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা তার বাড়িতে অবস্থান করছি।’

সাগরের মা সাহানাজ বেগম বলেন, ‘২২ দিনের মধ্যে ইতালি পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু এখন লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। তিনবেলার পরিবর্তে একবেলা খাবার দেওয়া হচ্ছে। ছেলে প্রায়ই ফোন করে কান্নাকাটি করছে।’

ফয়সাল হোসেনের মা পারুল বেগম বলেন, ‘চাহিদার চেয়েও ৭ লাখ টাকা বেশি নিয়েছে হাবিব মাস্টার। কিন্তু আমার ছেলে এখনো বন্দি। তাকে না খাইয়ে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’

ধজি হামিদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রায় ছয় মাস আগে হাবিবুর রহমান ব্যক্তিগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে পদত্যাগ করেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন মাদ্রাসায় অনুপস্থিত ছিলেন। পরে তারা জানতে পারেন, শিক্ষকতার আড়ালে তিনি মানবপাচার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন, যা প্রতিষ্ঠানের জন্যও লজ্জাজনক।

কৃষি ব্যাংকের গোপালপুর হাট শাখার ব্যবস্থাপক কে এম আতাহার হোসেন বলেন, কৃষি ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে হাবিবুর রহমানের অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক তার হিসাবগুলো ফ্রিজ করেছে।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ভুরঘাটা উপশাখার ইনচার্জ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার আশঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংক তার হিসাব ফ্রিজ করেছে। এরপর থেকে ওই হিসাবে আর কোনো লেনদেন হচ্ছে না।

অভিযুক্ত খন্দকার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ায় কিছু সমস্যায় পড়েছি। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে। লিবিয়ায় আটকে থাকা যুবকদের দ্রুত মুক্ত করে ইতালিতে পাঠানো হবে। আমি কারও টাকা আত্মসাৎ করব না, কোথাও পালিয়েও যাব না।’

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ সাব্বির হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা হাবিবুর রহমানের বাড়ি ঘেরাও করেছেন—এমন খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। ক্ষতিগ্রস্তদের থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

/এসএন