• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:১৮ এএম


দুই বছর পরও অনিশ্চয়তায় জুলাই শহীদ সাব্বিরের পরিবার, চার সন্তান নিয়ে দ্বারে দ্বারে স্ত্রী

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৮ জুলাই ২০২৬ ৬:৫১ পিএম

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার আশুলিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কারখানা শ্রমিক সাব্বির ইসলাম। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তার পরিবার এখনো দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের সংকটে দিন কাটাচ্ছে। নিজের কোনো ভিটেমাটি না থাকায় সাব্বিরকে দাফন করা হয়েছিল অন্যের জমিতে। আর এখন চার সন্তানকে নিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তার স্ত্রী ফরিদা আক্তার।

বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় সম্প্রতি তাদের ভাড়া বাসা থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছে। অভাব-অনটনের কারণে তিন সন্তানের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে।

সোমবার (৬ জুলাই) দুপুরে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান এলাকায় সাব্বির ইসলামের পরিবারের খোঁজ নিতে গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়।

সাব্বিরের শ্যালক মো. চঞ্চল মিয়া জানান, তার বোন ফরিদা আক্তার কখনো আত্মীয়ের বাড়ি, কখনো অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন। নিজের বাড়িতেও জায়গার সংকট থাকায় স্থায়ীভাবে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ভাড়া বাসায় উঠলেও ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় সেখান থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার ভাড়া বাসা থেকে চাল-ডাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করার উদ্দেশ্যে বের হন সাব্বির ইসলাম। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

সাব্বির নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার লুনেশ্বর ইউনিয়নের খিলা বাউন্দি গ্রামের মৃত শুকুর আলীর ছেলে। তবে তার নিজের কোনো জমি না থাকায় শ্বশুরবাড়ি এলাকার অন্যের জমিতে তাকে দাফন করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুই দশক আগে বানিয়াজান গ্রামের ফরিদা আক্তারকে বিয়ে করেন সাব্বির। জীবিকার তাগিদে সাত বছর আগে আশুলিয়ায় গিয়ে একটি সরিষার তেলের কারখানায় চাকরি নেন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে সেখানে কোনোমতে সংসার চলছিল।

জুলাই আন্দোলনের সময় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। ৫ আগস্ট সকালে কাজের সন্ধানে বের হলেও পরিস্থিতি দেখে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাভারের বাইপাইল এলাকায় ডান কানের পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে গেলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

নিহতের স্ত্রী ফরিদা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আন্দোলনের কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ধারদেনা করে সংসার চলছিল। ক্ষুধার্ত সন্তানদের কষ্ট আর শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ দেখে তার স্বামী আন্দোলনে যোগ দেন।

তিনি বলেন, “ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলেছিল বাজার করে ফিরবে। কাজ না পেলে ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলন করে সরকার পতন ঘটিয়ে ঘরে ফিরবে। সরকার পতন হলো, কিন্তু আমার স্বামী আর ফিরল না।”

চার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাদের থাকার কোনো স্থায়ী জায়গা নেই। ভাড়া দিতে না পারলে বাসা ছাড়তে হয়। অভাবের কারণে সন্তানদের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেছে।

সাব্বিরের বড় মেয়ে লিজা আক্তার বলেন, বাবার মৃত্যুর পর তাদের জীবন অনিশ্চয়তায় ভরে গেছে। “বাসা ভাড়া দিতে না পারলে মালিক থাকতে দেয় না। আমরা এখন ঠিকমতো খেতেও পারি না, পড়াশোনাও করতে পারি না। আমাদের খবর কেউ নেয় না।”

স্থানীয় বাসিন্দা আঙ্গুর মিয়া বলেন, শহীদ সাব্বিরের পরিবারের জন্য সরকারি খাসজমি বরাদ্দ দিয়ে একটি ঘর নির্মাণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই ফাউন্ডেশন ২০২৪ সালে পরিবারটিকে পাঁচ লাখ টাকা সহায়তা দেয়। পরে ২০২৫ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং চলতি বছরের জুন মাসে ১০ বছর মেয়াদি আরও ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হয়।

আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহনূর রহমান বলেন, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পরিবারটি বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পাচ্ছে। জমিজমা না থাকায় সরকারি খাসজমি বরাদ্দ ও ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

/এএসএফ