রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভায় বিকল ট্রান্সফরমার মেরামতের পর বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করতে গিয়ে অতিরিক্ত ভোল্টেজের অভিযোগ উঠেছে। এতে তিনটি মহল্লার প্রায় ৩০০ বাড়ির টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, বৈদ্যুতিক বাতিসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সোমবার (১০ আগস্ট) দিবাগত রাত ২টার দিকে কাটাখালী পৌরসভার বাখরাবাজ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) কর্মীদের ঘিরে ফেলেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং নেসকো কর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।
ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে বন্ধ ছিল বিদ্যুৎ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোমবার রাতে বাখরাবাজ এলাকার একটি মসজিদের সামনে থাকা ট্রান্সফরমার হঠাৎ বিকল হয়ে যায়। এতে বাখরাবাজ মোল্লাপাড়া, মধ্যপাড়া ও স্কুলপাড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয়রা বিষয়টি নেসকোর কাটাখালী কার্যালয়ে জানান। পরে নেসকোর কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিকল ট্রান্সফরমার মেরামতের উদ্যোগ নেন।
মেরামতের পর রাতে একটি পোর্টেবল ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়। তবে সংযোগ দেওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বিপত্তি ঘটে।
বাতি পুড়ে যাওয়ার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন
স্থানীয়দের ভাষ্য, পোর্টেবল ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের সামনে থাকা একটি বৈদ্যুতিক বাতি বিকট শব্দে পুড়ে যায়।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে নেসকোর কর্মীরা দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। তবে এর আগেই তিনটি মহল্লার বিভিন্ন বাড়ির বিপুলসংখ্যক বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাসিন্দারা।
তাদের দাবি, অতিরিক্ত ভোল্টেজের কারণে টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, বৈদ্যুতিক বাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে।
নেসকো কর্মীদের ঘিরে ক্ষোভ
সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা সড়কে বেরিয়ে এসে নেসকোর কর্মীদের ঘিরে ফেলেন। কয়েকজন কর্মীকে মারধর করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং নেসকোর কর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।
প্রায় ৩০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী জেলা কমিটির আহ্বায়ক ও স্থানীয় বাসিন্দা নাহিদুল ইসলাম বলেন, তিনটি মহল্লার প্রায় সব বাড়িতেই ইলেকট্রনিক পণ্য নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা অভিযোগ জানাতে তার বাড়িতে আসছেন। তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। তার হিসাবে অন্তত ৩০০ পরিবার এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সানা জানান, তার বাড়ির বৈদ্যুতিক বাতির পাশাপাশি টেলিভিশন, ফ্রিজ ও এসিও নষ্ট হয়েছে। তার অভিযোগ, পোর্টেবল ট্রান্সফরমার চালু করার পরপরই এসব সরঞ্জাম পুড়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি
ঘটনার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য স্থানীয়ভাবে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কোন বাড়িতে কী ধরনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে, তা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কাটাখালী পৌর বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম বলেন, ওই এলাকায় প্রায় ৩০০টি বাড়ি রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির ধরন ও পরিমাণ জানতে বাড়ি ধরে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
যা বলছে নেসকো
নেসকোর রাজশাহী বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ তিনটি লাইনের মাধ্যমে করা হয়। কোনো কারণে দুটি লাইন এক হয়ে গেলে অস্বাভাবিক মাত্রায় বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের সমস্যা গ্রাহকের বাড়ির অভ্যন্তরেও হতে পারে অথবা মূল বিদ্যুৎ লাইনেও ঘটতে পারে। তবে ঠিক কোথায় এমন সমস্যা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার কারণে এতগুলো বাড়ির ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব নয়।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতেন না
তবে নেসকোর সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম চৌধুরী এবং প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) জিয়াউল ইসলাম জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ থেকে তাদের জানানো হয়নি।
তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক বাড়ির বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ঘটনার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে হবে, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
/এএসএফ