• ঢাকা
  • সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৬ এএম


আন্দামান ট্র্যাজেডি: ছেলে হারানোর শোকে বাবার মৃ/ত্যু

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ মে ২০২৬ ৮:৫৭ এএম

টেকনাফ পৌর সদরের শাপলা চত্বর থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দূরের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লাতুরীখোলা গ্রাম। ছোট্ট এই গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমানের ঘরে এখন শুধুই কান্না আর নিস্তব্ধতা। সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন তাঁর দুই ছেলে জুনায়েদ (১৯) ও তারেক (২০)। কিন্তু মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথের সেই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন দুজনই।স্বজনদের ভাষ্য, দালালদের প্রলোভনে পড়ে ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলারে উঠেছিলেন দুই ভাই। এরপর থেকেই তাঁদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। প্রতিটি দিন এখন পরিবারটির কাটছে উদ্বেগ, অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তায়।বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় অন্তত ২৬৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অধিকাংশই কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাসিন্দা। অনুসন্ধানে অন্তত ৪০ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে।সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নিখোঁজদের বেশির ভাগই কিশোর ও তরুণ। কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ লবণচাষি বা ক্ষুদ্র পেশাজীবী। উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই পরিবারের অজান্তে দালালচক্রের ফাঁদে পা দিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কয়েকজনকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।দুই সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়া জিয়াউর রহমান বলেন, “কত কষ্ট করে ছেলেদের বড় করেছি। এখন তারা সাগরে হারিয়ে গেছে। মরদেহটাও যদি পেতাম, নিজের উঠানে দাফন দিতে পারতাম।”একই গ্রামের মো. কালুর ছেলে এনায়েত রহমান (১৮) এবং আবদুর রহমানের ছেলে তারেক (১৭) একই ট্রলারে ছিলেন। তাঁদের পরিবারেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া।অসুস্থ বাবার সংসার চালাতে ইটভাটায় কাজ করতেন এনায়েত। পরিবারের সচ্ছলতার আশাতেই তিনি এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ান। তাঁর বাবা কালু বলেন, “যারা বেঁচে ফিরেছে, তাদের কাছ থেকে শুনেছি আমার ছেলেও সাগরে তলিয়ে গেছে। এখন আমাদের সামনে শুধু অন্ধকার।”অন্যদিকে টমটমচালক আবদুর রহমান ছেলেকে বৈধভাবে বিদেশ পাঠানোর স্বপ্ন দেখছিলেন।

কিন্তু ছেলে কাউকে কিছু না জানিয়েই দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে রওনা দেয়। তিনি বলেন, “আমি টাকা জমাচ্ছিলাম বৈধ পথে পাঠানোর জন্য। এখন শুধু আফসোস।”ছেলের শোকে বাবার মৃত্যুআন্দামান ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা সবচেয়ে নির্মমভাবে আঘাত হেনেছে সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া গ্রামে। নিখোঁজ কিশোর এনায়েত উল্যাহর শোকে স্ট্রোক করে মারা গেছেন তাঁর বাবা সলিম উল্যাহ (৫০)।পরিবার জানায়, কয়েক দিন ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। গত ১৯ এপ্রিল সকালে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে মারা যান।বড় ছেলে আবদুল্লাহ জানান, এনায়েতের বিদেশ যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালোই ছিল। সম্প্রতি পাসপোর্টও করেছিল সে। কিন্তু বন্ধুদের প্রভাবে গোপনে মালয়েশিয়ার পথে পাড়ি জমায়।অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর অপেক্ষাশাহপরীর দ্বীপ বাজারপাড়ার হাফেজ মো. সাউদের গল্প আরও হৃদয়বিদারক। ২৪ বছর বয়সী এই তরুণের রয়েছে ১৮ মাস বয়সী একটি সন্তান। তাঁর স্ত্রী বর্তমানে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।পরিবার জানায়, ৪ এপ্রিল কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান সাউদ।

পরে জানা যায়, দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন তিনি।স্ত্রী মুবিনা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাকে কিছু না জানিয়েই চলে গেছে। এখন জানি না, সে বেঁচে আছে কি না।”এক বাড়ির তিনজন নিখোঁজদক্ষিণপাড়ার জেলে হোসেন আলীর ছেলে ফরিদ সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাসপোর্টও জমা দিয়েছিলেন একটি এজেন্সিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দালালের প্রলোভনে পড়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেন।

এখন তিনিও নিখোঁজ।মা লায়লা বেগম ছেলের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে প্রতিদিন দরজার সামনে বসে থাকেন। তাঁর ভাষায়, “জানি না আমার ছেলে বেঁচে আছে, নাকি সাগর তাকে নিয়ে গেছে।”পাশের বাড়ির হোসাইন এবং সমুদ্রপারের জয়নালও একইভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।ছেলের শোকে হাসপাতালে মাবাহারছড়া ইউনিয়নের বড়ডেইল এলাকার কৃষক মো. আমিনের ১৬ বছর বয়সী ছেলে ওসমানও নিখোঁজদের একজন। অষ্টম শ্রেণি পাসের পর বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করত সে।

অল্প বয়সেই বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়ে।ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মা আনোয়ারা বেগম গুরুতর অসুস্থ হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।মো. আমিন বলেন, “উদ্ধার হওয়া একজন জানিয়েছে, আমার ছেলে ট্রলারে ছিল। এক দিন পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ভেসেছে। পরে ঢেউয়ে আলাদা হয়ে যায়। এরপর আর কোনো খোঁজ নেই।”

/বিএসএস