পাকিস্তানের চার প্রদেশ ভেঙে ছোট অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা, বাড়তে পারে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা
পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ ভেঙে একাধিক ছোট প্রশাসনিক অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা করছেন দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির—ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজ করা ও শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার যুক্তি সামনে থাকলেও, এ উদ্যোগের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার ও সেনাপ্রধানের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সমালোচকেরা।
তবে পাকিস্তানের চার প্রদেশ পুনর্গঠন কিংবা নতুন প্রশাসনিক অঞ্চল গঠনের বিষয়ে দেশটির সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবে কতটা এগিয়েছে, কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হতে পারে এবং এর ফলে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে পাকিস্তানের বর্তমান চারটি প্রদেশের পরিবর্তে ১২টি, ১৫টি কিংবা ১৬০টি ছোট প্রশাসনিক অঞ্চল গঠনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অঞ্চল নির্বাচিত প্রধান, প্রাদেশিক বা জেলা পরিষদ কিংবা সরকারের মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে বলে বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো চূড়ান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য নেই।
পাকিস্তানের বর্তমান চারটি প্রদেশ হলো পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান। দেশটির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রদেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জনসংখ্যা, অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে এসব প্রদেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির প্রাদেশিক কাঠামো মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বসবাস, যা দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। অন্যদিকে আয়তনে বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তানে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাস করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ এই প্রদেশে বসবাস করেন।
খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিনের বিদ্রোহ, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা এবং নিরাপত্তাসংকট পাকিস্তান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এসব অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থানীয় জনগণের অসন্তোষ মোকাবিলা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো দেশটির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন এর সমর্থকেরা। তাঁদের মতে, বিশাল জনসংখ্যা ও বিস্তৃত ভৌগোলিক আয়তনের কারণে চারটি বড় প্রদেশের মাধ্যমে কার্যকরভাবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন। ছোট প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, উন্নয়ন কার্যক্রম তদারক করা এবং জনগণের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সহজ হতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসিম মুনিরও মনে করেন, প্রদেশগুলোর বিশাল আয়তন সেগুলোকে কার্যকরভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। পাকিস্তানের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোকেও তিনি দায়ী করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট কতটা সমাধান করা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ বুঝতে শুধু প্রদেশগুলোর আয়তন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার দিকে নজর দিলেই হবে না। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি দেশটির সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এখনো দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ভারতের অর্ধেকেরও কম। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পাকিস্তানের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে সাময়িকীটি বিশ্লেষণ করেছে।
সাময়িকীটির ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পাশাপাশি দেশের মূল্যবান জমি ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত। এসব ব্যবসায় সেনাবাহিনীর প্রভাব এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটির দীর্ঘ সময় সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে কেটেছে। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই-পঞ্চমাংশেরও বেশি সময় দেশটি সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। অন্য সময়গুলোতে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রভাবে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত ছিল বলে সাময়িকীটি উল্লেখ করেছে।
ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দ্য ইকোনমিস্ট। সাময়িকীটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই দেশের বৈরিতা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি সামরিক বাহিনীর প্রতিরক্ষা বাজেট ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, নিরাপত্তাসংকট মোকাবিলার নামে নেওয়া কিছু নীতি আবার সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে ছোট ছোট প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহের পেছনে দুটি প্রধান কারণ তুলে ধরেছে দ্য ইকোনমিস্ট। প্রথমত, বর্তমান প্রাদেশিক কাঠামো দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বড় প্রদেশগুলোতে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের উপস্থিতি কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে।
পাঞ্জাবে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং সিন্ধুতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে সিন্ধুর রাজধানী করাচি পাকিস্তানের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় প্রদেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামরিক শাসনের সময়েও এসব রাজনৈতিক দল কিছুটা হলেও বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল।
প্রদেশগুলোকে ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ করা হলে এসব দলের সাংগঠনিক শক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব বদলে যেতে পারে। নতুন প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোতে ক্ষমতার বিন্যাস পরিবর্তিত হলে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে পারে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ধরনের পুনর্গঠন স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক ভারসাম্যকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে দুর্বল করে দিতে পারে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে আসিম মুনিরের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে দ্য ইকোনমিস্ট। সাময়িকীটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনাপ্রধানের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রদেশগুলোকে ছোট ছোট প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হলে বিদ্যমান আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর প্রভাব কমে যেতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে বেসামরিক নেতৃত্ব থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আসিম মুনিরের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। পিএমএল-এন ও পিপিপির মতো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমেও সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান কারাগারে রয়েছেন। তাঁর সমর্থকদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিক্ষোভের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধার মুখে পড়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিস্থিতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং বিরোধী দলগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা সহজলভ্য করা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর যুক্তিতে পাকিস্তানে নতুন প্রশাসনিক অঞ্চল গঠনের ধারণা আলোচনায় আসতে পারে। তবে এ ধরনের পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে নতুন অঞ্চলগুলোর ক্ষমতা, আর্থিক স্বাধীনতা, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে, তার ওপর।
নতুন অঞ্চলগুলোতে নির্বাচিত নেতৃত্ব, কার্যকর স্থানীয় পরিষদ ও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে, অঞ্চলগুলোর নেতৃত্ব যদি কেন্দ্রীয় সরকারের মনোনয়নের ওপর নির্ভরশীল হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতেই থাকে, তাহলে এই উদ্যোগ প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে মূলত এই আশঙ্কাই গুরুত্ব পেয়েছে। সাময়িকীটির মতে, পাকিস্তানের প্রদেশ ভাগের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় প্রশাসন শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার ও সেনাপ্রধানের প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে পরিকল্পনাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক সংস্কার কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংস্কারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, গণতান্ত্রিক ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক থাকে এবং এর মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয় কি না, তার ওপর।
/এএসএফ