ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ তুলে ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়েছেন শত শত মানুষ। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভ ঘিরে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। নতুন দিল্লির দিকে যাওয়ার সড়কগুলোতে ব্যারিকেড, যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ এবং কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকায় বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে ভোগান্তিতে পড়েন অনেকে। এ সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটকও করে পুলিশ।
বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা এক শিক্ষার্থী পরিস্থিতি নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্রিটিশ আমলে আমরা দমনপীড়নের কথা পড়েছি। আর আজ আমরা দেখছি দমনপীড়ন ঠিক কতটা নির্মম হতে পারে!’
নতুন দিল্লির দিকে যাওয়ার বিভিন্ন সড়ক ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। বহু যানবাহন থামিয়ে দেওয়া বা বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। শহরের কিছু এলাকায় বাস চলাচল করলেও নয়াদিল্লির অনেক অংশে গাড়ি প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এসব কারণে যন্তর মন্তরে পৌঁছানো বিক্ষোভকারীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তলস্তয় মার্গের কাছে যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথ ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলে সেখানে কয়েকজন বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন। পুলিশ তাঁদের বাধা দিতে এগিয়ে এলে অনেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ ধাওয়া করে তাঁদের আটক করে।
সারিতা বিহার থেকে স্কুটিতে করে আসা মীর জানান, বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে তাঁর দুই ঘণ্টা সময় লেগেছে। গন্তব্য থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে তাঁকে স্কুটি পার্ক করতে হয়। এত বাধার মধ্যেও কেন বিক্ষোভে এসেছেন, তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের যুবসমাজ। আমরা যদি না আসি, তবে কে আসবে?’
লক্ষ্মীনগরের বাসিন্দা ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সাফনা জানান, তিনি সকাল ৬টার দিকে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে অটোরিকশায় ওই এলাকায় পৌঁছান। তাঁর সঙ্গে আরও আটজন ছিলেন। তাঁদের দলের তিন নারী সদস্যকে আটক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে তাঁদের কোন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা তাঁরা জানেন না।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলতামাস অটোরিকশায় সরু গলি পেরিয়ে নিজামুদ্দিনের কাছে নামেন। সেখান থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা হেঁটে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছান তিনি।
আলতামাস বলেন, ‘ব্রিটিশ আমলে আমরা দমনপীড়ন সম্পর্কে পড়েছি। আজ আমরা নিজ চোখে দেখছি তা কতটা দমনমূলক হতে পারে।’ তিনি জানান, নিজের স্বার্থে নয়, দেশের স্বার্থেই বিক্ষোভে অংশ নিতে এসেছেন।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘সরকার আসবে আর যাবে, কিন্তু দেশকে টিকে থাকতে হবে।’ সর্বজনীন ভোটাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখা উচিত।’
২১ বছর বয়সী হর্ষিতের কাছেও বিক্ষোভটি ব্যক্তিগত গুরুত্ব বহন করে। তিনি জানান, ভোটার পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করলেও ঠিকানাসংক্রান্ত সমস্যার কারণে তাঁকে কার্ড দেওয়া হয়নি। অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (এআইআইএমএস) এলাকা থেকে ক্যাবে করে রওনা দিয়েছিলেন তিনি। তবে চালক বিভিন্ন গলি ঘুরিয়ে তাঁকে বিক্ষোভস্থলের কাছাকাছি নামিয়ে দেন।
নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে শুধু বিক্ষোভকারীরাই নন, সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েন। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ সংস্থা এমটিএনএলে কর্মরত এক নারী জানান, নয়াদিল্লি রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার হেঁটে তাঁকে কর্মস্থলে যেতে হয়েছে। মাসের দ্বিতীয় শনিবার জরুরি পরিষেবার দায়িত্ব থাকায় তাঁকে কাজে যেতে হচ্ছিল। জনপথ ও কনট প্লেসের সংযোগস্থলে তাঁকে আটকে দেওয়া হলেও পরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
পুনের চলচ্চিত্র নির্মাতা নীলেশ নাভলাখা কনট প্লেসে জানান, ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক মুহূর্ত মনে করায় তিনি তা সরাসরি প্রত্যক্ষ করতে দিল্লিতে এসেছেন। গত ৬ জুনের বিক্ষোভেও উপস্থিত ছিলেন তিনি।
নীলেশ বলেন, ‘সেদিনের পরিবেশ আর আজকের পরিবেশ আলাদা। আগের সেই সাফল্যের পর মানুষের মধ্যে মনোবল বেড়েছে।’ তবে মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কনট প্লেস থেকে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়নের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক যুদ্ধবীর সিংসহ অন্য বিক্ষোভকারীরা। তবে কেন্দ্রীয় দিল্লিতে আসা সবাই কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের হয়ে বিক্ষোভে অংশ নিতে আসেননি।
সুরজ নামের এক তরুণ জানান, তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে এসেছিলেন। তাঁর বাবা ওই দিনের জন্য নিজের দোকান বন্ধ রেখে বিক্ষোভের পরিস্থিতি দেখছিলেন।
নারেলা থেকে মোটরসাইকেলে আসা লক্ষণ জানান, সকালে মাকে কর্মস্থলে নামিয়ে দিয়ে তিনি কনট প্লেসে পৌঁছান। সেখানে বড় গাড়ি চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেখতে পান।
লক্ষণ বলেন, ‘আমি সিজেপি বা বিজেপি—কারও পক্ষেই নই। প্রশ্ন হলো, মানুষ যখন প্রতিবাদ করে, তখন কী জবাব দেওয়া হয়?’
তবে পুলিশের অবস্থান নিয়েও সহানুভূতি প্রকাশ করেন তিনি। লক্ষণ বলেন, ‘তাঁরাও আমাদের বাবা-মায়ের মতো। তাঁদেরও তো আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয়।’
১৯৮৪ সাল থেকে দিল্লিতে বসবাসকারী আরেক বিক্ষোভকারী কাজের ফাঁকে ছুটি নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেন। তিনি জানান, তাঁর অনেক বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিতে বসবাস করলেও ভোটার পরিচয়পত্র পাননি। ২০০০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ভোট দিলেও এবার ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখন তাঁরা আমাদের দাদু ও পরদাদুদের পরিচয়ের নথিপত্র চাচ্ছেন।’
বিক্ষোভস্থলে পুলিশের ধরপাকড়ের মধ্যে এক ব্যক্তিকে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ে হাস্যরস করে তিনি বলেন, ‘পুলিশ আমায় ধরলে আমি বলব, আমায় যেন মথুরায় নিয়ে যাওয়া হয়।’
ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ, প্রতিবাদের অধিকার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা ঘিরে দিল্লির এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে বাধা, ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার প্রশ্ন।
/এএসএফ