ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন রুমা বেগম। মেধা, শিক্ষা ও সাফল্যকে সঙ্গী করে একসময় নিজের জীবনের গল্প লেখার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সেই রুমা বেগমের ঠিকানা হয়েছে বরিশালের একটি বৃদ্ধাশ্রম।বিষয়টি শুনলে প্রথমে হয়তো মনে হতে পারে, এটি একজন সফল মানুষের গল্প। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সাফল্যের পরও জীবনের কোনো এক প্রান্তে তৈরি হয়ে যাওয়া গভীর শূন্যতার গল্প।বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকার ওই বৃদ্ধাশ্রমে বর্তমানে প্রায় ৭০ জন প্রবীণ মানুষ বসবাস করছেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, তাঁদের কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কেউ সন্তানদের কাছ থেকে দূরে, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে আপনজনের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের খাবার, আশ্রয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও একটি বিষয় কোনো প্রতিষ্ঠানই পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না—আপন মানুষের সঙ্গ।রুমা বেগম তাঁদেরই একজন।একসময় তাঁর পরিচয় ছিল মেধা ও সাফল্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হওয়া ছিল তাঁর জীবনের বড় অর্জন। অথচ বয়সের ভারে আজ তাঁর সামনে একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতা। দিনের অনেকটা সময় নীরবে কাটে। কখনো নতুন মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন, কখনো ফিরে যান পুরোনো দিনের স্মৃতিতে। মনে পড়ে যায় জীবনের ফেলে আসা মানুষগুলোর কথা।জীবন কখনো কখনো সত্যিই অদ্ভুত।একসময় পরীক্ষার ফলাফলের তালিকায় সবার ওপরে থাকা একজন মানুষ আজ দাঁড়িয়ে আছেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন এক পরীক্ষার সামনে। এই পরীক্ষার কোনো প্রশ্নপত্র নেই, ফলাফলও প্রকাশ হয় না। এখানে শুধু আছে অপেক্ষা—আপনজনের জন্য অপেক্ষা।রুমা বেগমের মতো এই বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন আসমা, খাদেজা, অঞ্জলী, উষা রানী, বানু ও কহিনূর বেগম। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা। কিন্তু তাঁদের কথার ভেতরে একটি জায়গায় যেন মিল রয়েছে—জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁরা আপন মানুষের সান্নিধ্য চান।অঞ্জলী রানীর চাওয়াটাও খুব বেশি নয়। শেষ বয়সে তাঁর আর কোনো বড় চাওয়া নেই। সন্তানরা কাছে এসে কিছুক্ষণ বসুক, দুটো কথা বলুক—এটুকুই তাঁর প্রত্যাশা।সারা জীবন সন্তানদের জন্য কত মা-বাবা নিজেদের স্বপ্ন, আরাম, অর্থ ও সময় বিসর্জন দেন। সন্তান বড় হয়, নিজের সংসার গড়ে, নিজের পৃথিবী তৈরি করে। আর কখনো কখনো সেই পৃথিবীতে বৃদ্ধ মা-বাবার জায়গা ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একসময় হারিয়েই যায়।তখন একটি বৃদ্ধাশ্রম শুধু একটি ভবন থাকে না। হয়ে ওঠে অনেক মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঘরের বিকল্প ঠিকানা।বরিশালের এই বৃদ্ধাশ্রমটিও সহজে টিকে নেই। পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি দানবাক্স নিয়ে মানুষের কাছ থেকে সহায়তা সংগ্রহ করে সেখানে থাকা প্রবীণদের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগাড়ের চেষ্টা করেন। আরেক প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মীদের পাশাপাশি নার্স ও থেরাপিস্টের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাসিন্দাদের দেওয়া হয় তিনবেলা খাবার।সেপ্টেম্বরেও ওই বৃদ্ধাশ্রমের ৭০ জন বাসিন্দার জন্য মগ ও পানির জগসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানটি শুধু প্রবীণদের আশ্রয় দেওয়াই নয়, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে যতটা সম্ভব নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখারও চেষ্টা করছে।তবু প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা সন্তানদের শিক্ষিত করি, প্রতিষ্ঠিত করি, ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিই। কিন্তু তাঁদের কি শেখাতে পারি, বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসে কয়েক মিনিট কথা বলাও দায়িত্ব?রুমা বেগম হয়তো জীবনের একটি পরীক্ষায় ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে এসে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো সার্টিফিকেট নয়, পদমর্যাদা নয়, এমনকি অর্থও নয়।প্রয়োজন একজন মানুষ।যে মানুষটি পাশে বসে শুধু বলবে, “রুমা আপা, কেমন আছেন?”হয়তো কোনো কোনো বৃদ্ধাশ্রমে এই একটি প্রশ্নই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় ওষুধ।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর
/বিএসএস