• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম


মেঘ-পাহাড়ের মাঝে সাদা মসজিদ, সাজেকের নতুন নান্দনিক প্রতীক

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২ অক্টোবর ২০২৬ ৪:৫৬ পিএম

চারদিকে সবুজ পাহাড়। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে এসেছে মেঘ। কখনো মেঘের চাদরে ঢেকে যায় চারপাশ, আবার কখনো রোদের আলোয় ঝলমল করে ওঠে পাহাড়চূড়া। এরই মাঝে সাদা রঙের নান্দনিক স্থাপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজ পাহাড়ের বুকে আঁকা কোনো সাদা চিত্রকর্ম।রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের রুইলুইপাড়ার এই দারুস সালাম জামে মসজিদ এখন শুধু ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নামাজ আদায়ের স্থান নয়, পর্যটকদের কাছেও অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।পাহাড়ি জনপদ সাজেক দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। মেঘ-পাহাড়ের অপূর্ব সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর এখানে ভিড় করেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক। তাদের মধ্যে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, সাজেকে এমন একটি মসজিদ থাকা, যেখানে বেড়াতে এসে নিয়মিত নামাজ আদায় করা যাবে।পর্যটকদের সেই চাহিদার কথা বিবেচনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ করা হয় দারুস সালাম জামে মসজিদ। বর্তমানে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি মসজিদটি সাজেকের নান্দনিক স্থাপত্যেরও একটি পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে।মসজিদের সাদা স্থাপত্য আর চারপাশের সবুজ পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন বিভিন্ন ধর্মের পর্যটক। কেউ স্থাপত্য দেখেন, কেউ মুঠোফোনে ছবি তোলেন, আবার কেউ সেলফিতে ধরে রাখেন সাজেক ভ্রমণের স্মৃতি। আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় পাহাড়চূড়ায় ভেসে আসে আজানের ধ্বনি।রংপুর থেকে সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আব্দুল কাদের বলেন, ‘পাহাড়ের চূড়ায় এত সুন্দর একটি মসজিদ দেখে মনে প্রশান্তি পেয়েছি। মসজিদের স্থাপত্যশৈলী আমাকে মুগ্ধ করেছে। সাজেকে পৌঁছেই এখানে এসে জোহরের নামাজ আদায় করেছি। কয়েকদিন থাকব, তাই নামাজ পড়তে আর সমস্যা হবে না।’ঢাকার পর্যটক আনিস মাহমুদ বলেন, ‘আগে সাজেকে এলে হোটেলে নামাজ আদায় করতে হতো। কয়েক বছর আগে এখানে জুমার মসজিদ নির্মাণ হওয়ায় এখন জুমার নামাজও আদায় করতে পারছি। একজন মুসলমান হিসেবে বিষয়টি ভালো লাগছে। পাশাপাশি মসজিদের সৌন্দর্যও মুগ্ধ করেছে।’জানা গেছে, ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাজেকের রুইলুইপাড়ায় হ্যালিপ্যাডের পাশে মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তৎকালীন ২৪ পদাতিক চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত মসজিদটির নাম দেওয়া হয় ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’।সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতায় এক একর জায়গার ওপর নির্মিত মসজিদটির আয়তন ৫ হাজার ২৬৫ বর্গফুট। এতে রয়েছে চারটি গম্বুজ ও একটি সুউচ্চ মিনার। পূর্ব-পশ্চিমে দৈর্ঘ্য ৬৫ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রস্থ ৮১ ফুট। চারতলা ভিত্তির ওপর নির্মিত মসজিদটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৮ টাকা। নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর।দারুস সালাম জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জহির বলেন, ‘মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান ও জামাত হয়। পাশাপাশি এখানে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করেন অসংখ্য মুসল্লি। রমজান মাসে খতমে তারাবির নামাজও অনুষ্ঠিত হয়।’তিনি জানান, ২০২২ সালের প্রথম রমজানে এশা ও খতমে তারাবির নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে মসজিদটিতে নিয়মিত সালাতের সূচনা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটকরাও এখানে নামাজ আদায় করেন।মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. জাফর আলম বলেন, ‘সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোন মসজিদটির তত্ত্বাবধান করে। তারা অর্থসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। এছাড়া স্থানীয় হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের দান-অনুদানে মসজিদের বিভিন্ন খরচ মেটানো হয়।’তবে পাহাড়চূড়ায় মসজিদ হওয়ায় রয়েছে পানি সংকট। জাফর আলম বলেন, ‘ওজুসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহারের জন্য পানি কিনে আনতে হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার লিটার পানি প্রয়োজন হয়। সবার সহযোগিতায় এই ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে।’সবুজ পাহাড়, মেঘ আর সাদা স্থাপত্য—এই তিনের মেলবন্ধনে সাজেকের দারুস সালাম জামে মসজিদ এখন ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও এক অনন্য দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। পাহাড়চূড়ায় ভেসে আসা আজানের ধ্বনি যেন সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে যোগ করেছে ভিন্ন এক আবহ।

/বিএসএস