স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলাম দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর অধিকার আদায়ের পাশাপাশি তার সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণের শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা ও দয়ার বন্ধন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও যত্নের যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা মুসলিম দম্পতিদের জন্য অনুকরণীয়।আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।’ (সুরা আন-নিসা: ১৯)অন্য আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বোঝাতে বলা হয়েছে, ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।’ (সুরা আল-বাকারা: ১৮৭)দাম্পত্য জীবনে সুন্দর আচরণের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি: ৩৮৯৫)রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও তাদের গুণের স্বীকৃতির একাধিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি হলো—১. খাদিজা (রা.)-এর কথা স্মরণ ও প্রশংসারাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও তিনি তাকে প্রায়ই স্মরণ করতেন এবং তার প্রশংসা করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে খাদিজা (রা.)-এর প্রতি যতটা ঈর্ষা অনুভব করেছি, অন্য কারও প্রতি ততটা করিনি। কারণ, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে প্রায়ই স্মরণ করতেন এবং তার প্রশংসা করতেন।’ (বুখারি: ৫২২৯)একই বর্ণনায় খাদিজা (রা.)-কে জান্নাতে একটি প্রাসাদের সুসংবাদ দেওয়ার কথাও এসেছে। এতে প্রিয় স্ত্রীর গুণ ও অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসার প্রকাশ ফুটে ওঠে।২. খাদিজা (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরারাসুলুল্লাহ (সা.) খাদিজা (রা.)-এর মর্যাদাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘পৃথিবীর নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ইমরান শ্রেষ্ঠ এবং নারীদের মধ্যে খাদিজা শ্রেষ্ঠ।’ (মুসলিম: ২৪৩০)খাদিজা (রা.)-এর ঈমান, ত্যাগ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সহযোগিতার যে মর্যাদা ছিল, এই বক্তব্যে তার স্বীকৃতি পাওয়া যায়।৩. আয়েশা (রা.)-কে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হিসেবে উল্লেখএকবার হজরত আমর ইবনুল আস (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মানুষের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে?’ তিনি বলেন, ‘আয়েশা।’ এরপর জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘পুরুষদের মধ্যে?’ তিনি বলেন, ‘তার বাবা।’ (তিরমিজি: ৩৮৮৬)স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ্যে স্বীকার করার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে স্বচ্ছন্দ ছিলেন, এই হাদিস তার একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।৪. আয়েশা (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদা প্রকাশহজরত আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ইমরান ও ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছেন। আর নারীদের ওপর আয়েশা (রা.)-এর মর্যাদা অন্যান্য খাবারের ওপর সারিদের মর্যাদার মতো। (বুখারি: ৩৪১১)এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদা স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন। স্ত্রীর গুণ ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়ার এটিও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।৫. দানশীলতার মর্যাদা প্রকাশরাসুলুল্লাহ (সা.) একবার তার স্ত্রীদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার হাত সবচেয়ে লম্বা, সে আমার সঙ্গে সবচেয়ে দ্রুত মিলিত হবে।’প্রথমে স্ত্রীদের মধ্যে হাত মাপা হলে সাওদা (রা.)-এর হাত সবচেয়ে লম্বা মনে হয়েছিল। পরে বোঝা যায়, এখানে ‘লম্বা হাত’ বলতে শারীরিক দৈর্ঘ্য নয়, বরং বেশি দানশীলতাকে বোঝানো হয়েছিল। সাওদা (রা.) দান-সদকা করতে ভালোবাসতেন। পরবর্তী সময়ে তিনিই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তার স্ত্রীদের মধ্যে সবার আগে ইন্তেকাল করেন। (বুখারি: ১৪২০)রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনের এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীকে ভালোবাসা, তার ভালো গুণের স্বীকৃতি দেওয়া, প্রশংসা করা এবং মর্যাদা প্রকাশ করা সুন্দর দাম্পত্য আচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।তিনি খাদিজা (রা.)-এর অবদান ও মর্যাদা স্মরণ করেছেন, আয়েশা (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন এবং তাদের বিশেষ গুণ ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। দাম্পত্য জীবনে পরস্পরের ভালো গুণের প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও সম্মান প্রদর্শন সম্পর্ককে আরও সুন্দর ও মধুর করে তুলতে পারে।রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পারিবারিক জীবনের এসব দৃষ্টান্ত থেকে মুসলিম দম্পতিদের ভালোবাসা, সম্মান ও সুন্দর আচরণের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
/বিএসএস