ইসলামে মানুষের সম্মান, ইজ্জত ও সুনাম রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই কোনো নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে জেনে-শুনে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা গুরুতর গুনাহ। বিশেষ করে কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ করা হলে এর সামাজিক ক্ষতির পাশাপাশি ইসলামী শরিয়তেও এর বিষয়ে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদকে ইসলামী ফিকহে ‘কযফ’ বলা হয়। কোনো নির্দোষ ও চরিত্রবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ এনে তা শরয়ি প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তা কযফ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদের ৮০ বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। তারাই ফাসিক।’ (সুরা আন-নুর, আয়াত ৪)ইসলামী ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলোতেও অভিযোগ ও প্রমাণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।দাবির প্রমাণপদ্ধতি‘মিরকাতুল মাফাতীহ’-এ হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে—‘তবে প্রমাণের দায়িত্ব দাবিদারের ওপর এবং অস্বীকারকারীর ওপর কসম বর্তাবে।’ইমাম নববি (রহ.) বলেন, এটি শরিয়তের বিধানগুলোর একটি মহান ও সার্বজনীন মূলনীতি। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি শুধু নিজের দাবি করলেই তা গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং দাবির পক্ষে প্রমাণ প্রয়োজন অথবা যার বিরুদ্ধে দাবি করা হয়েছে, তার স্বীকৃতি প্রয়োজন। (মিরকাতুল মাফাতীহ ৭/২৫০, কিতাবুল আকদিয়াহ ওয়াশ শাহাদাত, ইমদাদিয়া)কযফের সংজ্ঞা ও শাস্তি‘আল-ইনায়া শারহুল হিদায়াহ’-তে কযফের সংজ্ঞা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ভাষাগতভাবে কযফ অর্থ নিক্ষেপ করা। আর ফকিহদের পরিভাষায় কোনো সুরক্ষিত বা চরিত্রবান ব্যক্তিকে স্পষ্টভাবে কিংবা ইঙ্গিতে ব্যভিচারের সঙ্গে অভিযুক্ত করাকে কযফ বলা হয়। অপবাদকারী তার অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে, শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তার ওপর কযফের হদ প্রযোজ্য হতে পারে।গ্রন্থটিতে এ প্রসঙ্গে কোরআনের আয়াত ‘আর যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে…’ উল্লেখ করে স্বাধীন ব্যক্তির জন্য ৮০ বেত্রাঘাতের বিধানের কথা বলা হয়েছে। (আল-ইনায়া শারহুল হিদায়াহ ৫/৩১৬, কিতাবুল হুদুদ, বাব হদ্দিল কাযফ, দারুল ফিকর)তবে এ ধরনের শরয়ি শাস্তি ব্যক্তিগতভাবে কেউ প্রয়োগ করতে পারে না। হুদুদসংক্রান্ত বিধান প্রয়োগের জন্য ইসলামী বিচারব্যবস্থা, নির্ধারিত শর্ত এবং যথাযথ প্রমাণের বিষয় রয়েছে।মিথ্যা অপবাদের পর তওবার উপায়কেউ যদি জেনে-শুনে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাকে, তাহলে তার জন্য জরুরি হলো—১. অবিলম্বে মিথ্যা অপবাদ ও ওই গুনাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসা।২. যার ওপর অপবাদ আরোপ করা হয়েছে, তার কাছে যথাসম্ভব ক্ষমা চাওয়া এবং তার সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।৩. নিজের অপবাদের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সম্ভব হলে দূর করার উদ্যোগ নেওয়া।৪. আল্লাহ তাআলার কাছে আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তিগফার করা।ইসলামে মানুষের সম্মান ও অধিকার রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। তাই কোনো নির্দোষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে জেনে-শুনে মিথ্যা চরিত্রহননমূলক অভিযোগ করা গুরুতর গুনাহ। তবে কোনো ধর্ষণের অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণের বিষয়টি প্রমাণ, তদন্ত ও যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে; শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বা মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা ইসলামী ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
/বিএসএস