২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো বা হামলার নির্দেশ দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা বর্তমানে কোথায় আছেন—এ প্রশ্ন নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহল রয়েছে। ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলটির সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লে পুলিশের অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তাও আত্মগোপনে চলে যান। কেউ কেউ বিদেশে চলে গেছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জুলাই আন্দোলন দমনে জড়িত বিভিন্ন রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং জেলার এসপিদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলাও হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু পুলিশ কর্মকর্তা বিভিন্ন মাধ্যমে তদবির করে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রেখেছেন। বিচারের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে তাদের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও বহাল রয়েছেন।
আন্দোলন দমন ও নির্যাতনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে অনুসন্ধানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, জুলাই আন্দোলনের সময় মেট্রোপলিটন, রেঞ্জ ও জেলা পর্যায়ে এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোট ১১৬ জন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ৪১ জন বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে পুলিশ সদর দপ্তর, এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন), রেলওয়ে পুলিশ, পুলিশ একাডেমি সারদা, বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টার ও অন্যান্য ইউনিটে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলন দমনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৩৫ শতাংশেরও বেশি কর্মকর্তা এখনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তাদের অভিযোগ, আইনের আওতার বাইরে থাকা এসব ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও এসপিরা পুলিশের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস এবং সাংগঠনিক অনৈক্য তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন।
অন্যদিকে, এখন পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মাত্র ১৭ জন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে, যা মোট সংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। আরও ৫৭ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে কাউকে পর্যায়ক্রমে অবসরে পাঠানো হচ্ছে, আবার কাউকে বরখাস্ত করা হচ্ছে। দেশের বাইরে অবস্থানরত পলাতক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে যেসব জেলার এসপিদের বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। কেউ সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন, কেউ কারাগারে আছেন, আবার কেউ বিচারাধীন মামলার আসামি হিসেবে পলাতক। অন্যদিকে, অনেক কর্মকর্তা এখনো পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, এপিবিএন, হাইওয়ে পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, সিআইডি, পুলিশ টেলিকমসহ বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তদবিরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদও পেয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালন করা ৭৭ জন এসপির মধ্যে ৩৫ জন এখনো বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্বে রয়েছেন। অর্থাৎ সে সময় দায়িত্ব পালনকারী এসপিদের প্রায় ৪৫ শতাংশই এখনো স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, ৪২ জন বা প্রায় ৫৪ শতাংশ এসপির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে সাময়িক বরখাস্ত ও বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত করা। এই তালিকায় পলাতক কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
গত দুই বছরে আটটি মেট্রোপলিটন পুলিশের সব কমিশনার এবং আটটি রেঞ্জের ডিআইজির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। এর মধ্যে আট কমিশনার ও ছয় ডিআইজিকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া তিন ডিআইজি ও একজন কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এদিকে, জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকারী ২১ জন অতিরিক্ত ডিআইজির মধ্যে ছয়জন এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। বাকিদের বিভিন্ন কার্যালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনের সময় দায়িত্ব পালনকারী ৩৫ জন এসপি বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশ, এপিবিএন, সিআইডি, পুলিশ স্টাফ কলেজ, রেলওয়ে পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, পিবিআই, পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, রেঞ্জ পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন।
একইভাবে, ওই সময় দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত ডিআইজিদের মধ্যে ছয়জন এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের কেউ পুলিশ সদর দপ্তরে, কেউ ডিএমপিতে, আবার কেউ পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার বা নৌ পুলিশে কর্মরত আছেন।
এছাড়া সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ১১ জন এসপির মধ্যে তিনজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন নোয়াখালীর সাবেক এসপি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, কুমিল্লার সাবেক এসপি আব্দুল মান্নান এবং বাগেরহাটের সাবেক এসপি আবুল হাসনাত খান। বরখাস্ত হওয়া তালিকায় আরও রয়েছেন ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামান, নারায়ণগঞ্জের গোলাম মোস্তফা রাসেল, লক্ষ্মীপুরের মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ, যশোরের প্রলয় কুমার জোয়ারদার, সিরাজগঞ্জের আরিফুর রহমান মণ্ডল, বগুড়ার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রংপুরের মো. শাহজাহান।
/এসএন