চব্বিশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা এবং সে বিষয়ে তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক এখনও আলোচনায় রয়েছে। পরবর্তী তদন্তে তার বিভিন্ন দাবি অসত্য বলে উঠে আসে। একই সঙ্গে পরবর্তীকালে ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়েও তিনি স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় জুনাইদ আহমেদ পলক দাবি করেছিলেন, ডেটা সেন্টারে আগুন, সাবমেরিন কেবলের তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। সে সময় সরকারিভাবেও জনগণের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে জানানো হয়, সন্ত্রাসীদের অগ্নিসংযোগে ডেটা সেন্টার ও আইএসপির তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হয়েছে এবং তা মেরামতে সময় লাগবে।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জাতীয় ও নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সহযোগিতা করলে সরকারকে কঠোর অবস্থানে যেতে হতো না।
একই দিন রাত ৯টা থেকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে পলক দাবি করেন, ১৮ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে অগ্নিসংযোগের কারণে মহাখালীর ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত কিলোমিটার ফাইবার অপটিক কেবলও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই আগারগাঁওয়ের ডাক ভবনে এক অনুষ্ঠানে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, মহাখালীর তিনটি ডেটা সেন্টারে আইএসপিগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ সার্ভার রয়েছে এবং দেশের ৩৪টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ের মধ্যে ১৮টির তথ্য ওই তিনটি ডেটা সেন্টারে হোস্ট করা হয়। তিনি তখন দাবি করেন, ‘সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেনি। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেছে।’
এর আগে ২৩ জুলাই মহাখালীর ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শনের সময়ও তিনি বলেছিলেন, অগ্নিসংযোগের কারণে ডেটা সেন্টার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা ইন্টারনেট বন্ধ করতে বাধ্য হন।
তবে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই জুনাইদ আহমেদ পলক আবারও বলেন, বাংলাদেশ পুরোপুরি ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং জরুরি সেবাগুলোতে সব সময় ইন্টারনেট চালু ছিল। গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোতেও সংযোগ সচল রাখা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কখনোই ইন্টারনেট বন্ধ রাখার পক্ষে না। আমরা কোনো অ্যাপ বন্ধ রাখি না।’
ইন্টারনেটের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও টানা ১৩ দিন বন্ধ ছিল। এ বিষয়ে পলক বলেছিলেন, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীল আচরণ এবং দেশের আইন মেনে চললে প্ল্যাটফর্মগুলো চালু করা হবে। তবে ওই সময় তিনি নিজে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে পরে জুনাইদ আহমেদ পলক আবারও ডেটা সেন্টারে আগুন এবং সাবমেরিন কেবলের তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তবে এসব তথ্যও অসত্য ছিল বলে জানান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পুরো দেশকে ইন্টারনেটবিহীন করে রেখেছিল তৎকালীন সরকার। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ডেটা সেন্টার পুড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন ঘটনার কথা বললেও বাস্তবে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনায় তিনি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) জড়িত ছিল এবং ডেটা সেন্টারের ঘটনার কথা প্রচার করে জাতির সঙ্গে মিথ্যাচার করা হয়েছে।
/এসএন