• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম


লাখ থেকে কোটি টাকা চাঁদা, টাকা তুলতে ডেভিড ইমনের ছিল আলাদা আলাদা দল

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৩১ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৬ পিএম

ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করতেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। চাঁদার টাকা সরাসরি না নিয়ে বাহকের মাধ্যমে নগদে সংগ্রহ করা হতো। টাকা তোলার জন্য এলাকাভেদে আলাদা ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁদের কাছ থেকে চাঁদার টাকা নগরের জিইসি মোড় এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে ইউসুফ নামের এক ব্যক্তির কাছে জমা দেওয়া হতো। পরে হুন্ডি ও কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সেই টাকা ইমনের কাছে পাঠানো হতো।

পুলিশ ও চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। গত বুধবার সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে তিন সহযোগীসহ ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

চাঁদার টাকা না পেয়ে হামলা-ভাঙচুর

গত সোমবার সকালে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে ইমনের অনুসারীরা হামলা ও ভাঙচুর চালান বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই ঘটনায় মামলা হওয়ার পর আবার ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

এর আগে গত ১৩ জুলাই নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে ২ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে ইমনের অনুসারীরা হামলা ও ভাঙচুর চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার পর মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং ইমনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ইমন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চাঁদা দাবির আগে তথ্য সংগ্রহ

পুলিশ জানায়, কারও কাছে চাঁদা দাবির আগে ওই ব্যক্তির আয়ের উৎস, বর্তমান সম্পদ ও নির্মাণাধীন ভবনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতেন ইমনের লোকজন। পরিবারের সদস্যদের জীবনবৃত্তান্তও সংগ্রহ করা হতো। এ জন্য এলাকাভিত্তিক সোর্স ছিল ইমনের।

তথ্য সংগ্রহের পর বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে নির্ধারিত ব্যক্তিকে ফোন করে কয়েক লাখ টাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হতো। ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা কে কোথায় থাকেন, কী করেন—এসব তথ্যও জানিয়ে দেওয়া হতো। চাহিদামতো টাকা না দিলে গুলি করার হুমকি দিতেন ডেভিড ইমন। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেলে হামলার ঘটনাও ঘটত।

চলতি মাসের শুরুতে ইমনকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়া এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলীর বড় দিঘিরপাড় এলাকার ওই ব্যবসায়ী ইমন গ্রেপ্তার হওয়ার পরও আতঙ্কে রয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ওই ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে জানান, জুন মাসের শেষের দিকে বিদেশি একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে তাঁকে ফোন করেন ডেভিড ইমন। নিজেকে সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী পরিচয় দিয়ে তিনি ওই ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবন ও বিভিন্ন ব্যবসার কথা উল্লেখ করে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ সময় ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়েরা কে কোথায় পড়াশোনা করেন, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দেন ইমন। চাহিদামতো টাকা না দিলে ব্যবসায়ীর কলেজপড়ুয়া বড় ছেলেকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

ওই ব্যবসায়ী জানান, নিরুপায় হয়ে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের মধ্যে রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। কয়েকজনের মাধ্যমে ইমনকে ফোনও করা হয়। কিন্তু কারও অনুরোধ শুনতে রাজি ছিলেন না তিনি। এর মধ্যেই নির্মাণাধীন ভবনে হামলা চালানো হয় এবং নিরাপত্তাপ্রহরীকে মারধর করা হয়।

ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘এরপর আমাকে আবার ফোন করা হয়। চাঁদা দেওয়ার মতো এত টাকা নেই জানিয়ে আমি তাঁকে অনুনয়-বিনয় করে চাঁদা কমানোর অনুরোধ করি। শেষে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা নির্ধারিত হয়। ইমন তখন বলেন, আমার লোকজন নগদে টাকা নেবে। যেখান থেকে বলা হবে, সেখান থেকে নিতে পারবে।’

পরে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করে ইমনের লোক পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাঁকে নগরের অক্সিজেন এলাকায় টাকা নিয়ে যেতে বলেন। ব্যবসায়ী জানান, তিনি সেখানে যেতে রাজি না হওয়ায় একটি অটোরিকশায় করে দুই যুবক বড় দিঘিরপাড়ে তাঁর বাসার সামনে আসে। নগদ পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে তারা একই গাড়িতে করে চলে যায়।

ইমনের মতো আরও অন্তত পাঁচজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয়েছে প্রথম আলোর। তাঁরাও সবাই বাহকের কাছে নগদে চাঁদার টাকা দিয়েছেন। তবে কেউই নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তাঁদের আশঙ্কা, ইমন জামিনে বেরিয়ে এলে ক্ষতি করতে পারেন। এ ছাড়া ইমনের অনেক সহযোগী এখনো বাইরে রয়েছেন।

চাঁদার টাকা জমা হতো ইউসুফের কাছে

পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইমনের লোকজন চাঁদার নগদ টাকা সংগ্রহ করে নগরের জিইসি মোড় এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেতেন। সেখানে ইউসুফ নামের এক ব্যক্তির কাছে টাকা জমা দেওয়া হতো। পরে ইমনের নির্দেশ অনুযায়ী ইউসুফ হুন্ডি কিংবা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে এসব টাকা পাঠিয়ে দিতেন।

ইমনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, ইউসুফকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাঁকে পাওয়া গেলে চাঁদাবাজির টাকা কোথায় যেত, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইমন জানিয়েছেন, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার কৌশল হিসেবে নগদে চাঁদার টাকা নেওয়া হতো। যাঁরা এসব টাকা সংগ্রহ করতেন, তাঁরা সাধারণত ওই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না; অন্য এলাকা থেকে এসে চাঁদার টাকা সংগ্রহ করতেন।

কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ বলেন, ‘তাদের একটি দল তথ্য সংগ্রহ করে, আরেকটি দল নগদ টাকা গ্রহণ করে, আরেকটি হামলা-ভাঙচুর কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় জড়ায়। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা দল রয়েছে।’

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, রিমান্ডে আনার পর ইমনের কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যে তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। চাঁদাবাজি কিংবা হামলার শিকার ব্যক্তিরা পুলিশকে এ বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।

ক্রিকেট ছেড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে

ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান।

স্থানীয় লোকজন জানান, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে গিয়ে অনুশীলন করতেন তিনি। পরে নগরের অক্সিজেন মোড়ে খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে খেলতেন এবং কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের মাধ্যমে তাঁর দলে যুক্ত হন ইমন। সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইমন বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হয়ে ওঠেন।

২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় আলোচনায় আসেন মোবারক হোসেন ইমন। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতেন—এমন তথ্য রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে দেশে সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান দলটির নেতৃত্বে আসেন।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন।

গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে ইমনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তখন তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি টাকা নিই এটা ঠিক, তবে সব বড়লোকদের কাছ থেকে।’

সন্ত্রাসের পথ কেন বেছে নিয়েছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, নয়তো বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।’