ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন করে চিন্তাভাবনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বুধবার ইরানে আবারও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে আরও একবার ‘ভয়াবহ হামলা’র হুমকি দিয়েছেন। তবে হামলার মাধ্যমে তেহরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার কোনো জোরালো লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক শান্তি ফিরিয়ে আনার যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ট্রাম্প স্বাগত জানিয়েছিলেন, অস্পষ্ট ভাষায় লেখা সেই সমঝোতা স্মারক এখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির সমীকরণ বদলে দিতে ট্রাম্পের সামনে থাকা বিকল্পগুলোও খুব একটা সুখকর নয়। স্থলযুদ্ধে শত শত মার্কিন সেনার জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কিংবা হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া—দুটিই তাঁর জন্য তিক্ত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। ‘উপযুক্ত কোনো পথ খোলা নেই’—কথাটি এখন যেন গতানুগতিক বুলিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিস’-এর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক লাইল গোল্ডস্টিন বলেন, ‘আমরা সত্যিই এক গভীর উভয় সংকটের মধ্যে পড়েছি।’
ইরান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এ কারণে স্থবির হয়ে পড়া কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে আবার সচল করতে বাইরের পক্ষগুলোও ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে।
হরমুজ প্রণালি যদি অধিকাংশ বেসামরিক জাহাজ চলাচলের অনুপযোগী বা ‘নো-গো জোন’ হয়ে যায়, তাহলে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব আরও ভয়াবহ হবে। এতে একদিকে বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত ফুরিয়ে আসতে পারে, অন্যদিকে ডিজেল ও সারের মতো জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের দামও আকাশচুম্বী হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে আসন্ন শীত মৌসুমে ইউরোপে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) তীব্র সংকটের আশঙ্কাও বাড়ছে। বিলাসবহুল পর্যটন ও প্রবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল, এই যুদ্ধ তা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের নড়বড়ে সরকারগুলোও এখন জনরোষ ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের গতিপথ নির্ধারণ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। বুধবার প্রকাশিত সিএনএন/এসএসআরএসের নতুন এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরান পরিস্থিতি ও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের গৃহীত নীতির প্রতি জনসমর্থন ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
এই জনমত জরিপের ফল আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প যে ভোটারদের সমর্থন পেয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতিকেও এটি অসার বা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে।
চিরাচরিত কূটনৈতিক কৌশলের মূল সাফল্য নিহিত থাকে নতুন সুযোগ তৈরি করা, বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া এবং সঠিক সময়টি চিহ্নিত করে প্রতিপক্ষকে সংঘাত থেকে পিছু হটতে রাজি করানোর মধ্যে। অন্যান্য সংকটের মতো এখানেও যুদ্ধ থামিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি করতে যে ধরনের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রয়োজন, তা এখনো কেবল কল্পনার মধ্যেই রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে এমন একটি সমঝোতার পথ খোঁজা যেতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তত সরাসরি স্বীকার করতে হবে না যে হরমুজের ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের কারণে তারা বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয়ের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, ইরানও প্রচার করার সুযোগ পাবে যে তাদের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনী যুদ্ধে ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হলেও তারা নিজেদের প্রধান অর্জনগুলো রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথ তৈরি করা বেশ কঠিন হবে। উত্তেজনা প্রশমনের প্রক্রিয়ার জন্য হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভবত বিভিন্ন বহিঃশক্তির সম্পৃক্ততাও দরকার হবে।
চরম কূটনৈতিক অচলাবস্থার এই মুহূর্তেও আশার দুটি ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। এর একটি হলো আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের নতুন একটি ধারণা। এর লক্ষ্য, ইরানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো যৌথভাবে এই বাণিজ্যিক রুট পরিচালনা করবে এবং এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম এমনভাবে বিন্যস্ত করবে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়।
পরিহাসের বিষয় হলো, সংকটের এই সমাধান হয়তো বাতিল হয়ে যাওয়া সেই সমঝোতা স্মারকের মধ্যেই সরাসরি ছিল। ওই দলিলে ইরান ও ওমানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, তারা যেন পারস্য উপসাগরের অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ‘হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও নৌ-পরিষেবা’র রূপরেখা নির্ধারণ করে।
কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর আরেকটি সম্ভাব্য পথ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের পক্ষ থেকেও উন্মোচিত হতে পারে। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে কূটনীতির পরিধি আরও বিস্তৃত করার এই মূল ভাবনা আবারও সামনে আসার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রধান কারণ, বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মতো তৃতীয় পক্ষগুলোরও অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় প্রকাশ্যে আসা একমাত্র কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল ইরান ও ওমানের মধ্যে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা। ওমানও হরমুজ প্রণালির উপকূলে অবস্থিত একটি দেশ। আলোচনায় মূলত প্রণালিটি আবার উন্মুক্ত করা হলে সেখানে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিএনএন এ সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ট্রানজিট ফি বা পারাপার শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তেহরানের অবস্থানের বিরোধিতা করেছে ওমান। আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিগুলোয় অবাধ ও নিরাপদ যাতায়াতের যে বিধান আন্তর্জাতিক আইনে রয়েছে, মূলত সেই যুক্তিতেই ওমান এই বিরোধিতা করেছে।
তবে অচলাবস্থা কাটাতে ওমান সরকার একটি সমঝোতামূলক প্রস্তাব তুলে ধরছে। এতে সরাসরি শুল্কের পরিবর্তে ‘সামুদ্রিক পরিষেবা’ বা ‘ম্যারিটাইম সার্ভিসেস’-এর জন্য ‘ফি’ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমান জটিলতা নিরসনে এটি একটি কৌশলগত বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘বোরসে অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন’ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই ‘হরমুজ ফি’র ধারণাটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য জলপথ ব্যবহারের ওপর সাধারণ কোনো টোল বা মাশুল আরোপ করা নয়; বরং পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে এই জলপথের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখা। এ মডেল অনেকটা ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযোগকারী ‘মালাক্কা প্রণালি’র ব্যবস্থার মতো হতে পারে, যেখানে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।
নিবন্ধটিতে নেদারল্যান্ডসের রটারডাম বন্দরে প্রচলিত ফির উদাহরণ দিয়ে সম্ভাব্য আয়ের একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বিশালাকার ট্যাংকারগুলোকে প্রতি গ্রস মেট্রিক টন পণ্যের জন্য প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ৮ ডলার ‘সাসটেইনেবিলিটি ফি’ দিতে হয়। লেখকদের হিসাব অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরেও একই ধরনের ফি আরোপ করা হলে প্রস্তাবিত নতুন প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ (২৬ মিলিয়ন) ডলার আয় করতে পারবে।
ধারণাটি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে, এমনকি ইরান যদি এর চেয়ে অনেক বেশি লভ্যাংশও দাবি করে। কারণ, প্রতি ব্যারেল তেলের দামের সঙ্গে অতিরিক্ত কয়েক ডলার যুক্ত হওয়াও তেলের বাজারের বর্তমান চরম অস্থিতিশীলতার তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। এই অস্থিতিশীলতার কারণে গত বুধবার এক দিনেই তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
নিবন্ধটির অন্যতম লেখক এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিদজ মনে করেন, এ ধরনের প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাবনার বিষয়ে তেহরান বাইরের অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি নমনীয় হতে পারে। তাঁর মতে, ইরান তার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, তাতে হরমুজ প্রণালিতে শুধু ফি আরোপের চেয়ে তাদের সামনে আরও বড় লক্ষ্য রয়েছে।
এসফান্দিয়ার বলেন, উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক পথ উন্মোচিত হলে এর ফলে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতে পারে কিংবা ইরানি তেল রপ্তানি আবার অবাধ হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ সমঝোতা তেহরানকে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা দেবে। এর মাধ্যমে তারা এই বার্তাই দিতে পারবে যে হরমুজ প্রণালি আর কখনোই যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যাবে না। মূলত এর মধ্য দিয়ে ইরান এটাই প্রমাণ করতে চাইবে যে তারা পরাজিত হয়নি; বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেও নিজেদের কর্তৃত্ব ও শক্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছে।
আরও বিস্তৃত পরিসরে বলতে গেলে, প্রণালিটির ব্যবস্থাপনায় বহুজাতিক একটি পরিকল্পনা উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠা একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। প্রশ্নটি হলো, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা ইরানের চ্যালেঞ্জ ওই অঞ্চলের দেশগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবে এবং যেকোনো সম্ভাব্য শান্তিকে কীভাবে সুসংহত করবে।
তবে ট্রাম্প আবার ইরানে হামলার পথ বেছে নেওয়ায় ফলপ্রসূ কোনো কূটনৈতিক আলোচনার পথ আপাতত রুদ্ধই থাকছে। হরমুজ প্রণালি স্থিতিশীল করার কোনো চুক্তি হলেও তা কেবল যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট নতুন সংকটগুলোর সমাধান দেবে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কোনো সুরাহা তাতে হবে না।
তবু লাইল গোল্ডস্টিন মনে করেন, ট্রাম্পের সামনে এখন বিকল্পের এতটাই সংকট যে শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি সমঝোতায় পৌঁছানোই হয়তো শেষ পর্যন্ত অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে।
গোল্ডস্টিন বলেন, ‘এটি সম্ভাব্য সব সমঝোতার মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক হতে যাচ্ছে। ঠিক এ কারণেই রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শক্তি হিসেবে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘকাল ধরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে আমাদের অন্যতম মৌলিক আদর্শ হিসেবে দাবি করে এসেছি।’
অধিকাংশ আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক চাপ জোরালো করতে এত দিন মিত্র দেশগুলোর দ্বারস্থ হতেন। উদাহরণ হিসেবে, ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তির ক্ষেত্রে কূটনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি ছিল ইউরোপ। ইরানের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর এমন কিছু কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ছিন্ন করে দিয়েছিল।
তবে আটলান্টিক পাড়ের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মৈত্রী বা ‘ট্রান্স-আটলান্টিক অ্যালায়েন্স’-এর ব্যাপক ক্ষতি করেছেন ট্রাম্প। একের পর এক বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপ এবং কটু মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে প্রায় শত্রুর মতো আচরণ করেছেন।
এমনকি মিত্র দেশগুলো যে যুদ্ধকে ‘অবৈধ ও অবিবেচনাপ্রসূত’ বলে মনে করে, তা শুরুর আগে ট্রাম্প তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক অভিযানে যোগ না দেওয়ায় তিনি সেই মিত্রদেরই তীব্র তিরস্কার করতে ছাড়েননি।
এর ফলে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকা ইউরোপীয় নেতাদের এখন ট্রাম্পকে সাহায্য করার খুব একটা তাগিদ বা অনুপ্রেরণা নেই। পাশাপাশি ন্যাটো মিত্রদেরও পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণে সক্ষম নিজেদের শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তাব ইউরোপীয় দেশগুলো দিয়েছে ঠিকই। তবে তারা তা দিয়েছে সব শত্রুতা ও যুদ্ধংদেহী তৎপরতা বন্ধ করার শর্তে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপের যেকোনো উদ্যোগ ওমানের মতোই একই প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তা হলো, একটি পরাশক্তির অস্থির ও বিভ্রান্তিকর কূটনৈতিক কৌশল, যা মূলত ট্রাম্পের মেজাজ-মর্জির ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ব্রাসেলসভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো ইয়ান লেসার বলেন, ‘একটি সুনির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত কৌশল বাস্তবায়নে ইউরোপের সহযোগিতা চাওয়া এক বিষয়। কিন্তু বর্তমানে তেমন কোনো ঐকমত্যের কৌশলই নেই। প্রকৃতপক্ষে এ মুহূর্তে আমেরিকার কৌশল ঠিক কী, তা মোটেই স্পষ্ট নয়।’
মার্কিন উদ্দেশ্য নিয়ে একই ধরনের অবিশ্বাসও কূটনীতিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এসফান্দিয়ার বলেন, ‘তেহরানের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আমার আলাপচারিতায় এমন ইঙ্গিত মিলেছে যে ওমান যে প্রস্তাব সামনে এনেছে, তারা তা নাকচ করে দিচ্ছে না।’
তবে এসফান্দিয়ার আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে উত্তেজনা বাড়িয়েই চলেছে, সেখানে এই মুহূর্তে প্রণালির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি ইরানকে ভাবিয়ে তুলছে। তাঁর মতে, ‘ইরান সম্ভবত কোনো এক সময় এ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দেবে। সেটি তাদের নিজেদের স্বার্থেই জরুরি। তারা সম্ভবত কোনো আঞ্চলিক কাঠামোর অধীনে এটি করবে। তবে মার্কিনরা তাদের ‘উচিত শিক্ষা’ পেয়েছে, এমনটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা সে পথে হাঁটবে না।’
ট্রাম্পের এই যুদ্ধ থামাতে না পারায় ওমানের মতো অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিকেও চরম মাশুল দিতে হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান যদি দ্রুত এই পরস্পরকে উসকে দেওয়া ধ্বংসাত্মক আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, তাহলে অন্যদের হস্তক্ষেপ করা বা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না।