• ঢাকা
  • রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৫ পিএম


বিবিসির বিশ্লেষণ

তিন দিকের হাম/লার চাপে উভয় সংকটে সৌদি আরব

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৩০ জুলাই ২০২৬ ১১:০১ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরব এখন কঠিন এক নিরাপত্তা ও কৌশলগত সংকটের মুখে পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই রিয়াদ সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সম্প্রতি তিন দিক থেকে হামলার মুখে পড়ে সেই অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে।

চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি প্রক্সি মিলিশিয়াদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদের ধারণা, এসব গোষ্ঠীই ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি ভূখণ্ডে একের পর এক হামলা চালিয়ে আসছে। এখন সৌদি নেতৃত্বের সামনে বড় প্রশ্ন—পাল্টা হামলা চালিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে, নাকি পরিস্থিতি শান্ত করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ কিংবা আর্থিক সমঝোতার পথ বেছে নেওয়া হবে।

সংঘাতে কারা জড়িত?

গত পাঁচ মাস ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে চলমান সংঘাতে মূলত দুটি পক্ষ সক্রিয় রয়েছে।

একদিকে রয়েছে ইরান এবং দেশটির ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)। তাদের মিত্রদের মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী, যারা ২০১৪ সালে দেশটির বড় একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। পাশাপাশি ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসও ইরানের সমর্থনপুষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে। সৌদি আরবের দাবি, এই আধাসামরিক বাহিনী তাদের ওপর প্রায় ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহও ইরানের মিত্র হলেও বর্তমানে তুলনামূলক নীরব অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তাদের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম), উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর একটি অংশ এবং জর্ডান। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বর্তমানে ইরাকসংক্রান্ত এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিচ্ছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মূলত জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে কেন্দ্রীভূত করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নতুন নিয়ম ও নির্ধারিত রুট এড়িয়ে চলা বাণিজ্যিক জাহাজও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইরাকের মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে বিশ্লেষকেরা সংঘাতের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি না হলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

কেন যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চাইছে রিয়াদ?

সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশের অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনতে ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য আধুনিক ও বহুমুখী শিল্প গড়ে তোলা এবং প্রতি বছর কর্মবাজারে প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

এ পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ডাটা সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ। তবে ইয়েমেন থেকে হুতিদের ড্রোন হামলা এবং ইরান থেকে সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি থাকলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

২০১৯ সালের হামলার স্মৃতি

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব বড় ধরনের ধাক্কা খায়। সে সময় ইরান-সমর্থিত একটি ইরাকি মিলিশিয়া আবকাইক ও খুরাইসের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় সমন্বিত ড্রোন হামলা চালায়। যদিও সে সময় কেউ কেউ হামলার জন্য ইয়েমেনের হুতিদের দায়ী করেছিলেন, তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার চিহ্ন উত্তর দিক থেকে আসা আক্রমণের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

ওই হামলায় কয়েক দিনের জন্য সৌদি আরবের প্রায় অর্ধেক তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়।

এদিকে, গত সোমবার প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতেও দেখা গেছে, আবকাইক তেল স্থাপনাটি আবারও ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।

তেল রপ্তানি ও নতুন সংকট

সৌদি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি এখনো তেল। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।

এর জবাবে সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু রপ্তানি টার্মিনালে পাঠাতে শুরু করে। সেখান থেকে ট্যাংকারে করে আরব সাগর হয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তেল পাঠানো হচ্ছিল এবং শুরুতে এই পরিকল্পনা কার্যকর বলেই মনে হয়েছিল।

হুতিদের নতুন হুমকি

তবে ১৩ জুলাই সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানার বাইরে একটি বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালায়। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার দাবি করে, একটি ইরানি বিমানকে সেখানে অবতরণে বাধা দিতেই এ হামলা চালানো হয়েছিল।

এর জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের আভা ও জিজান আঞ্চলিক বিমানবন্দরে হামলা চালায়। পাশাপাশি তারা লোহিত সাগরে চলাচলকারী সৌদি জাহাজও লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করেছে।

ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এশিয়ায় সৌদি তেল রপ্তানির ওপর।

ভিশন ২০৩০-এর বাইরে নতুন বাস্তবতা

সৌদি আরব সাত বছর ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েও তাদের দমন করতে পারেনি। ইয়েমেনের এই যুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব এখনো অব্যাহত রয়েছে।

২০২২ সালে সৌদি আরব হুতিদের সঙ্গে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। সংঘাত কমাতে কিছু আর্থিক সমঝোতার খবরও সে সময় প্রকাশিত হয়েছিল।

কিন্তু বর্তমানে দক্ষিণে ইয়েমেন থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং উত্তরে ইরাক থেকে হামলার দ্বিমুখী হুমকির মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ধনী দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, ভিশন ২০৩০ প্রণয়নের সময় এমন জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা কল্পনাও করা হয়নি।

(অনলাইন বিবিসি থেকে অনুবাদ)

/এসএন