সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বা নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন কাঠামোর মূল বেতন কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নতুন ভাতাসমূহ কার্যকর হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শুরু থেকে। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন এই বেতনকাঠামো চালু হলে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি পে কমিশনের সুপারিশগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছে। বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক তিনটি পে কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই এই রোডম্যাপ অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিললে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ-সংক্রান্ত সরকারি গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নেবে অর্থ বিভাগ।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একাধিক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রথমদিকে তিন বছর মেয়াদি বাস্তবায়ন পরিকল্পনার বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও কারিগরি জটিলতা এড়াতে দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাবই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা আইবিএএসপ্লাসে (iBAS++) কোনো জটিলতা সৃষ্টি না করতে একবারেই পুরো মূল বেতন কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছে অর্থ বিভাগ। তবে সামগ্রিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দুই ধাপেই সম্পন্ন করার দিকেই বর্তমানে মনোযোগী রয়েছে সংশ্লিষ্ট কমিটি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানের ২০টি গ্রেডের মধ্যে ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১০০ শতাংশ বা তার কাছাকাছি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডের নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য প্রায় ১৩০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো চালুর ঘোষণা দেন। এ কার্যক্রমের প্রাথমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাজেটে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
যদিও বাজেট বক্তব্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই বরাদ্দ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের জন্য ব্যয় করা হবে। নেট পাবলিক সার্ভিস খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই অর্থের সংস্থান করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি।
নবম পে কমিশনের সুপারিশে মূল বেতনে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির পাশাপাশি আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়িত হয়েছিল, যা দুই ধাপে কার্যকর করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবারও দ্রুত নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে সরকার প্রায় ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন-ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে সরকারি সেবার মানোন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
/এসএন