দিনভর কাজের ব্যস্ততা, নানা ধরনের চিন্তা ও শারীরিক ক্লান্তির পর রাতের ঘুম মানুষের শরীর ও মনকে প্রশান্তি দেয়। তবে একজন মুমিনের কাছে ঘুম কেবল বিশ্রামের বিষয় নয়। ঘুমানোর আগে কিছু সুন্নত আমল পালন করলে স্বাভাবিক এই বিশ্রামের সময়টিও সওয়াব অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
এসব আমলের মধ্যে অন্যতম হলো অজু করে ঘুমানো। রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে এমন একটি জীবনব্যবস্থা শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে ঘুমের মতো দৈনন্দিন কাজও আল্লাহর স্মরণ ও সুন্নত পালনের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত হতে পারে। শয্যায় যাওয়ার আগে অজু করার মাধ্যমে একজন বান্দা পবিত্র অবস্থায় রাত কাটানোর সুযোগ পান। হাদিসে এ আমলের সঙ্গে ফেরেশতার দোয়ার বিশেষ ফজিলতের কথাও বর্ণিত হয়েছে।
অজু করে ঘুমানো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন তুমি তোমার শয্যায় যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো অজু করবে। এরপর ডান কাতে শুয়ে পড়বে…।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৭)
অজু করে ঘুমালে ফেরেশতা দোয়া করেন
পবিত্র অবস্থায় রাত কাটানোর অন্যতম বড় ফজিলত হলো বান্দার জন্য ফেরেশতার দোয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় রাত কাটায়, তার সাথে একজন ফেরেশতা রাতযাপন করেন।
সে যখন জাগ্রত হয়, তখন ফেরেশতা বলেন—হে আল্লাহ! আপনার এই বান্দাকে ক্ষমা করুন; কারণ সে পবিত্র অবস্থায় রাত কাটিয়েছে।’ (সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস: ১০৫১)
অর্থাৎ একজন মানুষ যখন গভীর ঘুমে থাকেন, তখনও তার জন্য একজন ফেরেশতা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একজন মুমিনের জন্য এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি বিষয়।
অজুর সঙ্গে আল্লাহর স্মরণ
শুধু অজু করাই নয়, ঘুমানোর আগে আল্লাহকে স্মরণ করাও মহানবী (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) শয্যায় যাওয়ার সময় বিভিন্ন দোয়া ও জিকিরের শিক্ষা দিয়েছেন।
বারা ইবনে আজিব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে শয্যায় যাওয়ার সময় অজু করে ডান কাতে শোয়া এবং একটি বিশেষ দোয়া পড়তে শিখিয়েছেন।
এরপর বলেছেন, ‘যদি তুমি ওই রাতে মারা যাও, তবে তুমি ফিতরাতের ওপর মৃত্যুবরণ করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭১০)
রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দোয়া কবুলের সুসংবাদ
অজু ও আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে রাত কাটানোর আরও একটি বিশেষ ফজিলতের কথা হাদিসে পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিম পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর জিকির করতে করতে রাত কাটায়, অতঃপর রাতে জেগে উঠে দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে তা দান করেন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৪২)
তাই মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে আবার ঘুমিয়ে না পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় করা কোনো দোয়া কবুল হওয়ার সুযোগও থাকতে পারে।
অজু অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়
অজু শুধু বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার মাধ্যম নয়; এটি একজন মুসলিমের আত্মিক পবিত্রতারও একটি উপায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কিন্তু তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের ওপর তার নিয়ামত পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬)
অজুর পাশাপাশি ঘুমের অন্যান্য সুন্নত
ঘুমানোর আগে অজু করার পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও কিছু আমলের শিক্ষা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
১. বিছানা ঝেড়ে নেওয়া।
২. ডান কাতে শোয়া।
৩. মাসনুন দোয়া পড়া।
৪. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা।
৫. সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া।
৬. তাসবিহে ফাতেমি পাঠ করা।
৭. আল্লাহর নাম স্মরণ করে ঘুমানো।
অতএব, রাতের নীরবতায় যখন চারপাশের মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে, তখন একজন মুমিনের জন্য সেটি আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার বিশেষ একটি সময় হতে পারে। ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিটের অজুও হয়ে উঠতে পারে রাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। পবিত্র অবস্থায় ঘুমানোর মাধ্যমে ফেরেশতার দোয়া, আল্লাহর রহমত এবং অন্তরের প্রশান্তি লাভের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
/এসএন