হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা নিজেরাই ফিরে এসেছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লায় নিখোঁজ হওয়ার পর ১৩ বছর বয়সী শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের লাশ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরে নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো কোনো শিশুর লাশ মাটিচাপা অবস্থায়, আবার কারও লাশ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ হওয়ার পর লাশ উদ্ধারের ঘটনা ছাড়াও চলতি বছরে শিশু ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের একটি শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর আর বাড়িতে ফেরেনি। পরে ১২ সেপ্টেম্বর তার এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় শিশুটির লাশ পাওয়া যায়।
পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, ওই শিশুকে তার সহপাঠীর বাবা ধর্ষণের পর হত্যা করেন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করে আসক। সংগঠনটির হিসাবে, গত আট মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে।
এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮ শিশু, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ শিশু এবং ধর্ষণের পর ২৬ শিশু নিহত হয়েছে। ধর্ষণের পর নিহতদের মধ্যে দুইজন ছেলে শিশু। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার পর চারজন, গুলিতে তিনজন, গৃহকর্মী হিসেবে শারীরিক নির্যাতনে দুইজন এবং উত্ত্যক্তকারীর হাতে দুইজন শিশু নিহত হয়েছে। অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে একজনকে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও লাশ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনা রয়েছে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশুর নিহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত তিন বোনের মধ্যে সিপার বয়স ছিল ১০ বছর, ইকরার ১৭ বছর এবং সাইমা আক্তারের বয়স ছিল ২১ বছর।
আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে খুন করা হয় ১২ বছরের ছেলে আয়ুশকেও।
একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর লাশ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তার এক বছর বয়সী সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এদিকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গত ২২ মে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় ইউনিসেফ। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এসব ঘটনায় দায়মুক্তির অবসানের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ঘর, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি পরিসরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ইউনিসেফের পক্ষ থেকে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রেও জবাবদিহি বাড়ানোর কথা তুলে ধরা হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল শিশুহত্যা ও শিশুদের প্রতি নির্মমতার মতো অপরাধ নিয়ে খোঁজখবর রাখেন। শনিবার তিনি বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নৃশংসতা একটি সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখন প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা আসলে কোথায়। খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকা—কোনো জায়গাতেই যেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
শিশুদের ওপর এ ধরনের সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ বা পারিবারিক বিরোধও ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেন ফাতেমা রেজিনা ইকবাল। তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড়দের মধ্যকার বিরোধ বা হিংসার শিকারও হচ্ছে শিশুরা।
তার মতে, এসব ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।
/এসএন