দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার তার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব পদেও পরিবর্তন আসতে পারে।
মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করার পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি হওয়ায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হবেন—এমন সম্ভাবনাই জোরালো। গত কয়েক সপ্তাহের আলোচনা, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম।
তবে এখনো রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা রয়েছে।
মির্জা ফখরুলের নাম রাষ্ট্রপতি পদে জোরালোভাবে আলোচনায় আসার মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে তার কার্যালয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ে শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড় জমে। অনেকে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর চেষ্টা করেন।
তবে এ বিষয়ে মির্জা ফখরুলকে খুব বেশি উৎসাহী দেখা যায়নি। শুভেচ্ছা জানাতে আসা ব্যক্তিদের তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে হোক, তারপর।’
এরপরও তিনি সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। পরে বেইলি রোডের সরকারি বাসভবনে যান তিনি। সেখানেও সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড় ছিল।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, আগামী বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন। ওই দিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে।
দলীয় সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে তার শেষ কর্মদিবস আজ অথবা আগামীকাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কিছু দায়িত্ব পালনের সুযোগ তার থাকতে পারে। আগামী ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে গত কয়েক দিন ধরে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামও বেশ জোরালোভাবে আলোচনায় আসে।
এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খানের নাম নিয়েও দলের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত ১ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর অর্পণ করা হয়। বৈঠক শেষে বিষয়টি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল নিজেই।
দলের ভেতরে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম গুরুত্ব পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা বলা হচ্ছে। প্রায় দুই দশক ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। জাতীয় রাজনীতিতেও দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ তিনি। পাশাপাশি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
বিএনপির নেতাকর্মীদের মতে, দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় মির্জা ফখরুল সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের বিভিন্ন প্রতিকূল সময়ে তিনি নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। পরবর্তীতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেও বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সজ্জন ও তুলনামূলক সংযত রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও মির্জা ফখরুলের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। ২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর থেকে তিনি দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে রাষ্ট্রপতি পদে নিজের সম্ভাব্য মনোনয়ন নিয়ে এখনো সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি মির্জা ফখরুল। গতকাল বিকেলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে এই মুহূর্তে কিছুই বলার নেই। ১৩ আগস্টের পর দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বিষয়টি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। লুকোচুরির কিছু নেই। দলের সর্বোচ্চ ফোরামের সিদ্ধান্ত আগেই জানানো হয়েছে—রাষ্ট্রপতি প্রার্থী দলীয়ভাবে চূড়ান্ত করবেন পার্টির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর বা সম্মতি দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, মনোনয়ন ফরম তুলতে হলে স্বাক্ষর বা সম্মতির প্রয়োজন নেই। স্বাক্ষরের বিষয়টি রয়েছে মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে। এ সময় তিনি বলেন, ‘এখানে গণমাধ্যম অতিউৎসাহী হয়ে অনেক কিছুই লিখেছে। এটা কোনো স্ট্যান্ডার্ড লেভেলের মধ্যে পড়ে না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘আমরা চেয়ারম্যানের ওপর এ দায়িত্ব দিয়েছি। তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন। দলের তিনজনের নাম বেশ আলোচনায় আসছিল। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম বেশি আলোচনায় আছে। এখন দেখা যাক, চেয়ারম্যান কী সিদ্ধান্ত নেন।’
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে এবং স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা চলছে। প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আরও কয়েক দফা আলোচনা ও বৈঠক হবে।
তবে দলীয় সূত্র, রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান আলোচনা এবং মির্জা ফখরুলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে তার নামই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরাই ভোটার। গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের তালিকা প্রকাশ করেছে।
নির্বাচনী তপশিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর ১৬ আগস্ট হবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ভোট অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট। ওই দিন জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে।
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের বিধান থাকায় কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা গোপন থাকে না।
এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ কার্যত খুবই সীমিত।
/এসএন