২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবনে প্রবেশের পর ছাত্রদল নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ নাঈম,
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় জনতার দখলে চলে যায় গণভবন। সেই সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ করে ‘গণভবন এখন আমাদের দখলে’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা এক তরুণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ওই তরুণ হলেন ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহ-সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ নাঈম।
ঘটনার দুই বছর পর জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে সেদিনের অভিজ্ঞতা, আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণ, গণভবনে প্রবেশের পরিকল্পনা, ভাইরাল ভিডিও প্রকাশের পর পাওয়া হুমকি এবং জুলাই আন্দোলনের স্মৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তিনি।
নাঈম বলেন, ৫ আগস্ট গণভবনে প্রবেশ করার সাহস শুধু তার একার ছিল না; সেদিন রাজপথে থাকা অসংখ্য মানুষের মধ্যেই একই সাহস কাজ করেছিল।
তার ভাষায়, ‘জুলাই আন্দোলনে আমরা কেউ ভাবিনি বেঁচে ফিরব কি না। আমাদের বিশ্বাস ছিল, প্রয়োজন হলে জীবনের বিনিময়েও একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই রাজপথে নেমেছিলাম।’
তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে দেশে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত ছিল। বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী হতে হতে তাদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।
নাঈম বলেন, ‘আমি মনে করেছি, সবাই ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পায় না। জুলাই আমাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছিল। তাই আমি এবং আমার পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি।’
খালেদ সাইফুল্লাহ নাঈম জানান, ৫ আগস্ট গণভবনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক ছিল না। কয়েক দিন আগে থেকেই এ বিষয়ে তার পরিকল্পনা ছিল।
তার ভাষ্য, ‘৩ আগস্ট থেকেই বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হচ্ছিল, যদি গণভবন জনতার দখলে আসে তাহলে কে কী করবে। তখন আমি বলেছিলাম, যদি সুযোগ পাই, শেখ হাসিনার দক্ষিণ পাশের কক্ষে গিয়ে চা খাব।’
তিনি জানান, ৫ আগস্ট গণভবনে প্রবেশের পর তিনি সরাসরি ভবনের দ্বিতীয় তলায় চলে যান।
নাঈম বলেন, ‘আমার লক্ষ্যই ছিল ওই কক্ষে যাওয়া। সেখানে গিয়ে দেখি পুরো রুম ফাঁকা। কাউকে পাইনি। তবে লাইট, এসি, ফ্যান সব চালু ছিল। খাটের পাশে কয়েকটি লাগেজ গুছানো অবস্থায় ছিল। জুতাও পড়ে ছিল। দেখে মনে হয়েছে, তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়ার সময় সেগুলো নেওয়ার সুযোগ হয়নি।’
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নাঈম বলেন, সকালে বৃষ্টি হলেও আন্দোলনকারীরা রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় জড়ো হন। সেখানে সেনাবাহিনীর ব্যারিকেড ছিল। পরে আন্দোলনকারীরা সামনে এগিয়ে যান।
তার ভাষ্য, ‘আমরা সেনাবাহিনীকে বলেছিলাম, এই জনস্রোত থামানো সম্ভব নয়। আমরা সংঘর্ষ চাই না, শান্তিপূর্ণভাবে এগোতে চাই। পরে ব্যারিকেড অতিক্রম করে গণভবনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি।’
তিনি আরও বলেন, আগারগাঁওয়েও ব্যারিকেড ছিল। পরে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখেন।
তার দাবি, ‘হেলিকপ্টারটি উড়ে যেতে দেখে আমাদের মনে হয়েছিল, শেখ হাসিনা হয়তো তখনই চলে গেছেন।’
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নাঈম। তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ে এত মানুষকে নিহত হতে দেখেছি যে, এরপর নিজের জীবনের চেয়ে অধিকার আদায়ই বড় হয়ে উঠেছিল। আমরা মনে করেছি, আমাদের জীবন গেলেও যদি একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে ওঠে, সেটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।’
গণভবনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নিজের জীবন বদলে গেছে বলে দাবি করেন নাঈম।
তার ভাষায়, ‘ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই আমাকে ও আমার পরিবারকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমাকে হত্যা করা হবে, লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে—এমন অসংখ্য বার্তা এসেছে। এখন পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি হুমকি পেয়েছি বলে আমার ধারণা।’
তিনি দাবি করেন, এসব হুমকি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে এসেছে।
নিজের চেয়ে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করে নাঈম বলেন, ‘রাজপথের রাজনীতি করলে মৃত্যু-ভয়কে অতিক্রম করতেই হয়। নিজের জন্য ভয় পাই না। কিন্তু দেশের জন্য কাজ করার কারণে আমার পরিবারের কেউ যেন ক্ষতির মুখে না পড়ে, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।’
তিনি জানান, তাদের তিন ভাই-ই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং জুলাই আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন।
খালেদ সাইফুল্লাহ নাঈম রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা। মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মেসি বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রফেশনাল মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন।
তার পরিবারের সদস্যরাও দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তার বাবা অধ্যক্ষ এ কে এম লোকমান ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার নজরুল নগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। মেজ ভাই হাসিবুর রহমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। ছোট ভাই এহতেশামুল হক সাকিব ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং তিনি কবি নজরুল সরকারি কলেজে অধ্যয়ন করছেন।
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় বলে জানান নাঈম।
তার ভাষায়, ‘১৮ ও ১৯ জুলাই মিরপুরে আমার চোখের সামনে সহযোদ্ধাদের গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি। একজনকে কাঁধে হাত দিয়ে ধরেছিলাম। কয়েক মুহূর্ত পরই সে মারা যায়। সেই দৃশ্য এখনো ভুলতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাইয়ের কথা মনে পড়লে এখনো রাতে ঘুমাতে পারি না। নিজের চোখের সামনে অসংখ্য মানুষকে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি। আহত মানুষে হাসপাতালগুলো ভরে গিয়েছিল। সেই স্মৃতিগুলো এখনো আমাকে তাড়া করে।’
সবশেষে তিনি জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে বলেন, আন্দোলনে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের ভূমিকা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্টদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
/এসএন