১. শাহজালাল মাজারের দানবাক্সের টাকা প্রতিদিন গণনা, ৩৫ শতাংশ যাবে উন্নয়নে
২. শাহজালাল মাজারের দানের অর্থে নতুন নিয়ম, ৬৫ শতাংশ ব্যয় হবে পরিচালনায়
৩. প্রতিদিন গণনা হবে শাহজালাল মাজারের দানের টাকা, গঠন হচ্ছে নতুন কমিটি
৪. মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো, ৩৫ শতাংশ থাকবে উন্নয়নের জন্য
৫. শাহজালাল মাজারে দানের টাকা নিয়ে অবসান হলো দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্তহীনতার
সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে প্রতিদিন দানের টাকা গণনা করা হবে। গণনা করা অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজের জন্য ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। বাকি ৬৫ শতাংশ ব্যয় করা হবে মাজারের দৈনন্দিন পরিচালন খরচ ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
সভা শেষে কমিটির সদস্যসচিব ও সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন এসব তথ্য জানান। নতুন এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শাহজালাল মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা নিয়ে প্রায় দুই মাস ধরে চলা সিদ্ধান্তহীনতার অবসান হলো।
জেলা প্রশাসক বলেন, এখন থেকে মাজারের দানের অর্থ প্রতিদিন গণনা করা হবে। গণনা করা টাকার ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজের জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা রাখা হবে। ওই হিসাবটি সিলেটের জেলা প্রশাসক ও মাজারের মতোয়াল্লির যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে।
অবশিষ্ট ৬৫ শতাংশ অর্থ মাজারের দৈনন্দিন ব্যয় এবং কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।
অর্থ গণনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মাজার কমিটির পক্ষ থেকে একজন ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ম্যানেজার হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন অথবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি একজন হিসাবরক্ষক ও একজন অফিস সহকারীও নিয়োগ দেওয়া হবে।
মাজার পরিচালনার জন্য একটি পৃথক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, সাত সদস্যের ওই কমিটির আহ্বায়ক থাকবেন জেলা প্রশাসক। এতে সিলেট সিটি করপোরেশন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট মহানগর পুলিশ ও সিলেট জেলা পরিষদের একজন করে প্রতিনিধি এবং পুলিশ সুপার সদস্য হিসেবে থাকবেন। মাজারের মতোয়াল্লি কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। আর নিয়োগ দেওয়া ম্যানেজার কমিটির সাচিবিক কাজে সহযোগিতা করবেন।
এই কমিটি মাজারের নিরাপত্তা ও উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের নেওয়া উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সে সময় এক মাসের মধ্যে মাজার পরিচালনার জন্য একটি যৌক্তিক ও সমন্বিত কাঠামোর সুপারিশ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে প্রায় আড়াই মাস পর কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাল।
এতদিন মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের উদ্যোগের পর থেকে দানের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হচ্ছিল। গণনা শেষে অর্থ জেলা প্রশাসনের একটি খোলা ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হচ্ছিল। এতে মাজার পরিচালনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন মাজারের খাদেমরা।
এর আগে মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সিলেট জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে গত ১৮ জুন বিকেলে মাজারে থাকা পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে মাজারে দান করা নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগও সিলগালা করা হয়।
দানবাক্স ও ডেগ সিলগালার পর জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের পদক্ষেপ নিয়ে সিলেটজুড়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা শুরু হয়। এক পক্ষের দাবি ছিল, মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগ কার্যকর। অন্য পক্ষ অভিযোগ করে, স্বচ্ছতার নামে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো একতরফা ও জোরপূর্বক এবং মাজারকেন্দ্রিক প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এরই মধ্যে ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। পরদিন তার উপস্থিতিতে দানবাক্স সিলগালার চার দিন পর জনসমক্ষে বাক্স খুলে অর্থ গণনা করা হয়।
প্রথম দফায় গত ২২ জুন দানবাক্স থেকে নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশি মুদ্রা পাওয়া যায়। পরে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকার একটি চেক যুক্ত হওয়ায় মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা।
এর ১৮ দিন পর ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় দানবাক্স খুলে ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা পাওয়া যায়। এ সময় বিভিন্ন দেশের মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণ ও রৌপ্যও পাওয়া যায়।
সর্বশেষ ১৫ আগস্ট তৃতীয় দফায় দানবাক্স ও মানতের ডেগ খোলা হলে ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা পাওয়া যায়। তখনও দেশি-বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলঙ্কার পাওয়া যায়।
এরপর সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর দানবাক্স থেকে ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা পাওয়া যায়। সেদিনও নগদ অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মুদ্রা এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের অলঙ্কার পাওয়া গেছে।
/এএসএফ