সম্প্রতি ঢাকায় পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও সরকারি দপ্তরে চাঁদা চেয়ে ই-মেইল পাঠিয়েছে একটি চক্র। চাঁদার টাকা পাঠাতে ই-মেইলে ক্রিপ্টোকারেন্সির ঠিকানার পাশাপাশি একাধিক বিকাশ ও নগদ নম্বরও দেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে এক সপ্তাহের মধ্যে বোমা হামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি ইতোমধ্যে দূতাবাসগুলোর পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরকে জানানো হয়েছে। এরপর কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নজরদারি বাড়িয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল।
পুলিশের দাবি, একটি চক্র দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে এসব হুমকি ও চাঁদা দাবির ই-মেইল পাঠিয়ে থাকতে পারে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গত ১৭ আগস্ট ‘ইউসুফ খান’ নামের একটি আইডি থেকে প্রথম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিএসএটি ঠিকানায় ই-মেইল পাঠানো হয়। এর দুই দিন পর ১৯ আগস্ট ভিন্ন নাম ও ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করে আবারও একটি বার্তা পাঠানো হয়। ই-মেইলের বিষয় হিসেবে লেখা হয় ‘সেকেন্ড রিমাইন্ডার, সুন অ্যাকশন’।
একই সময়ে রাশিয়ার দূতাবাস, তাদের কনস্যুলার শাখা এবং চীনা দূতাবাসের সাংস্কৃতিক শাখাতেও ই-মেইল পাঠানো হয়। ই-মেইলগুলো আলাদা আলাদা ঠিকানা থেকে পাঠানো হলেও সেগুলোর বিষয়বস্তু প্রায় একই ছিল।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ই-মেইল লাটভিয়ার ওয়েবমেইল সেবা ‘ইনবক্স ডট এলভি’ ব্যবহার করে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ই-মেইল ঠিকানায় ‘ননস’ শব্দটিও উল্লেখ ছিল। বিভিন্ন দূতাবাসে পাঠানো বার্তাগুলোতে হুমকির ভাষা, চাঁদা দাবির ধরন, বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ পাঠানোর তথ্য প্রায় একই ছিল।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ১৭ আগস্ট পাকিস্তান দূতাবাসে পাঠানো প্রথম ই-মেইলে চাঁদা দাবি করা হয়। দুই দিন পর একই ধরনের ফরম্যাটে আবারও পাকিস্তান দূতাবাসে ই-মেইল পাঠানো হয়। সেখানে ১৪টি বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টে ১০ বিলিয়ন বাংলাদেশি টাকা পাঠানোর কথা বলা হয়।
বিকাশ ও নগদের বিকল্প হিসেবে পুরো অর্থ ‘উই আর কিপ্টো কিং’ নামে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্টে পাঠানোর কথাও উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট ও বিটকয়েন ওয়ালেটের ঠিকানাও দেওয়া হয়।
ই-মেইলে আরও হুমকি দেওয়া হয়, দাবি করা টাকা পরিশোধ না করলে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই দূতাবাস ভবনে বোমা হামলা করা হবে।
পাকিস্তানের পাশাপাশি আলাদা আলাদা ঠিকানা ব্যবহার করে রাশিয়া, তুরস্ক ও চীনের দূতাবাসেও একই ধরনের ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। এসব ই-মেইলেও ‘উই আর কিপ্টো কিং’ নামে একই ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। চীনা দূতাবাসে পাঠানো হুমকিসংবলিত একটি ই-মেইল একটি উগ্রবাদী সংগঠনের নামে পাঠানো হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
চাঁদা দাবি ও বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর দূতাবাসগুলো বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরকে অবহিত করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি।
এদিকে গুলশান, বারিধারাসহ পুরো কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, চক্রটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। ই-মেইলে যেসব বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন-চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল। তবে তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যতদূর আমরা অনুমান করছি—এটা একটা ভুয়া গ্রুপের কাজ হতে পারে। তারা মূলত দেশের ইমেজ নষ্ট করতে এবং সরকারকে বিব্রত করার জন্য এটি করছে। আমরা পুরো বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’
/এএসএফ