নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সফরের পাশাপাশি ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ পেয়েছে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাবেন কি না, সে বিষয়ে সরকার এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বিশ্বের প্রধান উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস। এবারের শীর্ষ সম্মেলন আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ব্রিকসের নিয়ম অনুযায়ী, বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের নেতাদের সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
তবে বুধবার পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম।
এর আগে সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন কি না। জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এর পরদিন মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত ব্রিফিং করেন। সেখানেও তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জয়সওয়াল বলেন, এ বিষয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য পাওয়া গেলে তিনি তা জানাবেন।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে দুই পক্ষ থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে চেষ্টা চালানো হয়েছে।
তাদের মতে, চলতি বছরের ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে বসে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে আবারও কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তবে তারেক রহমান ভারত সফর করলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সাবেক সচিব মাশফি বিনতে শামস বলেন, সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে তারেক রহমানের এই সফরে যাওয়া উচিত।
২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। বাংলাদেশ এখনো ব্রিকসের সদস্য দেশ নয়। তবে সংগঠনটির নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের নেতাদের সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক জোটটি হলো বিমসটেক বা বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন। বিভিন্ন সময়ে সদস্য দেশগুলোর সরকারপ্রধানেরা বিমসটেকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সাল থেকে এই জোটের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ। সেই হিসেবে বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারম্যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য ভারত আমন্ত্রণ জানিয়েছে। গত জুলাইয়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়ে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এর পর থেকেই প্রায় এক মাস ধরে আলোচনা চলছে, ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি না।
বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের ওই সফরে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত সোমবার বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, ‘চেয়ারপারসন অব বিমসটেক’ হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছেন এবং সেই চিঠিটি আমাদের সরকার গঠনের দিন হস্তান্তর করা হয়েছিল। সেখানে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রণ একটা আছে সেখানে, সেটা আমরা দেখব কোনো এক সময়ে।’
সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ওই দিনই ভারতে ফিরে যান হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
পরদিন মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের কাছে জানতে চাওয়া হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যেতে সম্মতি দিয়েছেন কি না।
জবাবে জয়সওয়াল বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি, সেই সঙ্গে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ সেশনে অংশগ্রহণের জন্যও আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য থাকলে আমরা আপনাদের জানাব।’
অর্থাৎ ভারত সরকারের কাছেও এখনো এমন কোনো বার্তা যায়নি যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেপ্টেম্বরে ভারত সফরে যাবেন কি না।
তবে সাবেক কূটনীতিকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই সফরে গেলে এবং সেখানে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে সম্পর্কের ইতিবাচক উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘এমন যদি হতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আগের দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করলেন। পরের দিন ব্রিকসের আউটরিচে অংশ নিলেন, এটা হলে পারফেক্ট হতো। কেননা, ব্রিকসে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকে প্রবেশের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। সেদিক থেকে এই সফর বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে বেশ টানাপোড়েন তৈরি হয়। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও ভিসা বন্ধের ঘটনাও ঘটে। সে সময় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে।
সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আবারও সেই সম্পর্ককে পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা আসার পরই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা অনলাইনে যুক্ত হয়ে অডিও বক্তব্য দেওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। পরদিন ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠকও করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে আরো বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি (শেখ হাসিনা) আবার সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্যও রেখেছেন, এবং সেটা যাতে না রাখতে পারে সে বিষয়ে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।’
তবে এই কূটনীতিকের মতে, শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া বা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। সে ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্কে এতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ত না।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মাশফি বিনতে শামস বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত পারস্পারিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। সেক্ষেত্রে গুরুত্ব পাওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পারিক বোঝাপড়ার বিষয়গুলো।’
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটানা বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এ সময়ে নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধীপক্ষগুলোর নানা অভিযোগ ছিল। তবে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন দেখা গিয়েছিল।
এ কারণে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী অবস্থান আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। সীমান্তে উত্তেজনাও তৈরি হয়। বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়।
বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও মাঠের রাজনীতিতে ভারতবিরোধী অবস্থান আরও স্পষ্ট করে।
কূটনীতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত, এনসিপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ভারত সফরের বিষয়ে বেশ সতর্ক। বিরোধীপক্ষের এই অবস্থানের কারণেও ভারত সফরের বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট রয়েছে।
কূটনীতিক বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে যারা বিরোধী দলে অর্থাৎ সংসদে অবস্থান করছে, তারা সম্ভবত কিছুটা কট্টরপন্থি। তাদের এই অবস্থানের কারণে, সরকার হয়তো অতটা সাহস পাচ্ছেন না এই ধরনের ক্ষেত্রে প্রো-ইন্ডিয়ান একটা সিদ্ধান্ত নিতে।’
তবে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সাবেক কূটনীতিকরা।
নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বলেন, ‘বাংলাদেশতো ব্রিকসের সদস্য হতে ইচ্ছুক। সেখানে গেলে এই ধরনের এনগেজমেন্ট সহজেই ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণকে আরো শক্তিশালী করবে।’
তার মতে, দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপোড়েন কাটিয়ে ওঠার জন্যও তারেক রহমানের এই সফর গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অন্যদিকে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানের মত হলো, শুধু ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য নয়, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ থাকলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া উচিত।
/এসএন